প্রকৃতির মাঝে সুইস ভ্যালি রিসোর্টে একদিন

প্রকৃতির নান্দনিকতায় মিলেমিশে আছে সুইস ভ্যালি রিসোর্ট



সুইস ভ্যালি রিসোর্ট

প্রকৃতির নান্দনিকতায় মিলেমিশে থাকা সুইস ভ্যালি রিসোর্ট। ছবি : সুমন্ত গুপ্ত



ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত নয়টা হবে, আমি আছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডুবে এরই মধ্যে মোবাইল ফোন ডেকে চলছে। মোবাইল ফোনে তাকিয়ে দেখি জাহাঙ্গীর স্যার ফোন দিচ্ছেন। আমি ফোন ধরতেই স্যার বলে উঠলেন কেমন আছো আসছে বন্ধে কোথাও যাচ্ছ নাকি? আমি বললাম এখনও কোন পরিকল্পনা করি নাই, তবে নতুন কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা আছে। স্যার বললেন, চলো সিলেটের মৌলভীবাজারের শমশেরনগরের সুইস ভ্যালি রিসোর্ট থেকে ঘুরে আসি। শুনেছি জায়গাটা খুব সুন্দর। আমি মনে মনে ভাবলাম স্যার এর অফারটা মন্দ নয়। যেই ভাবা সেই কাজ, যাবার জন্য দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম। দিবা প্রথম প্রহর আমরা বের হয়ে পড়লাম গন্তব্য পানে।

কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে ছুটে চললাম গন্তব্য পানে। আমরা চলছি বিমানবন্দর ষ্টেশন, ভৈরব ষ্টেশন পেড়িয়ে। সময়ে সাথে তাল মিলিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভানুগাছ ষ্টেশনে। এবার, এখান থেকে সুইস ভ্যালি রিসোর্টে পৌছতে হলে আমাদের সাত কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে হবে। আগের থেকেই গাড়ি ঠিক করে রাখা ছিল। আমরা চললাম সুইস ভ্যালি রিসোর্টের পানে। সূর্যদেবের প্রখরতা এখনও বাড়েনি। যেতে যেতে আশেপাশের গ্রামীণ পরিবেশ দেখতে ভালই লাগছিলো। দেখা পেলাম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি ঘাঁটির। স্বল্প সময়ের মাঝে আমরা এসে পৌঁছলাম সুইস ভ্যালি রিসোর্টের প্রবেশ দ্বারে। গাড়ি থেকে নামতেই হাসি মুখে এসে উপস্থিত হলেন একজন।

জাহাঙ্গীর স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন উনি হচ্ছেন রাকিব সাহেব, সমগ্র রিসোর্টটির দায়িত্বে আছেন। আমরা এগিয়ে চললাম সম্মুখ পানে। অসাধারণ পরিবেশ, নেই কোনো কোলাহল , চারিদিকে পাখির মিষ্টি ডাক। গাছের ডাল আর কাঠের তৈরি অসাধারণ ডিজাইনের আসবাবপত্র সম্বলিত একটি কক্ষে প্রবেশ করলাম। রাকিব সাহেব বললেন, এই হল আপনাদের রুম। কোনো কিছু লাগলে বলবেন, আপনাদের জন্য আমাদের কর্মী বাহিনী সদা প্রস্তুত। বেশ পরিপাটি করে সাজানো রুম। যা স্বকীয়তা প্রমাণ দিয়ে যায় বারবার।

বিনোদন ব্যবস্থা

গরমের দিন তাই একটু ক্লান্তই লাগছিল , প্রবেশ পর দেখা পেয়েছিলাম আঁকাবাঁকা সুইমিং পুলের। তাই ভাবলাম ক্লান্তি দূর করতে সুইমিং পুলের জলে ঝাপাঝাপি করতে পারলে মন্দ হয় না। যেই ভাবা সেই কাজ , দিলাম ঝাপ সুইমিং পুলে।


সুইস ভ্যালি রিসোর্ট

রিসোর্টে রয়েছে সুইমিং পুল ও। ছবি : সুমন্ত গুপ্ত



সুইমিং পুলের গভীরতা এতো বেশী না তাই সাঁতার না জানলেও নিশ্চিন্তে নেমে পরা যায়। সুইমিং পুলের ঝাপাঝাপি পর এবার তো পেট পূজা করতে হয়, সেই কখন দানাপানি দিয়েছিলাম পেটে। আমার ঝাপাঝাপির ফাঁকে জাহাঙ্গীর স্যার আগের থেকেই লাঞ্চের মেনু কনফার্ম করে রেখেছিলেন তাই খাবারের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় নাই। সাদা ভাত, মুরগীর মাংস, সবজি, দুই রকমের ভর্তা (টমেটো ও ধনেপাতা) এবং ডাল। প্রতিটি রান্না অসাধারণ স্বাদ। রকিব ভাই বললেন সবকিছুই মাটির চুলার রান্না। আমি বললাম রান্নার স্বাদ অসাধারণ এর কারণ তাহলে এইটাই। খুবই তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছি। খাওয়া প্রসঙ্গে একটি কথায় বলব দুইদিনে আমরা মোটামুটি যা যা খেয়েছি সবগুলোই খুব মজা লেগেছিল।

অভ্যরন্ত

ডাইনিং রুমের আসবাবপত্রগুলো গাছের ডাল আর কাঠের তৈরি অসাধারণ ডিজাইন। ও, বলে রাখা ভালো এখানে সকালে কমপ্লিমেন্টারি নাস্তা, দুপুরে আর রাতে সেট মেনু, বিকেলের নাস্তা ওদের মেনু থেকে পছন্দ করে অর্ডার করা যায়। বিকেলে রিসোর্টের ভেতরেই ঘুরাঘুরি করে কাটালাম। আমি আবার দোলনায় চড়ে বসলাম সেই ছোট বেলায় স্কুলে বন্ধুদের সাথে দোলনায় খেলার কথা মনে পড়ে গেল। নাস্তা আর চা পর্ব ও চলল। ভেতরে ট্রি হাউজ টাইপ কিছু জিনিস আছে, দোলনা, বাচ্চাদের স্লাইড , দুরে দুরে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন টাইপ বসার জায়গা , পুল এর পাশে ছাউনি , সেখানে আবার গদি দিয়ে আড্ডা দিয়ার ব্যবস্থা আছে। রিসোর্টে বেশ কিছু পাকা, আধ-পাকা এবং কাঠের কটেজ আছে যা আধুনিক সুযোগ সুবিধায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।

প্রতিটি কটেজেই আছে কেবল কানেকশনসহ টিভির ব্যবস্থা আর অত্যাধুনিক ফিটিংস সমৃদ্ধ ঝাঁ তকতকে বাথরুম। সুইসভেলির ডাইনিংটার চারপাশে খোলা। তাই ঠাণ্ডা বাতাসে আড্ডা টা পরিপূর্ণ ছিল। রাতের বেলা আমাদের জন্য বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হলো। আর বারবিকিউ পার্টি ছাড়া ভ্রমণ স্বাদই পূর্ণ হয় না। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই বেড়িয়ে পড়লাম আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে। দেখা পেলাম সুইসভেলির পাশেই পাহাড়, ডানকানের চা-বাগান, কৃষি খামারের মাঝে দেখলাম ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত বিমানবন্দরের, নাম দিলজান্দ বিমানবন্দরের। পাশে কয়েকটি প্রাকৃতিক হ্রদও আছে। শমশেরনগর চা-বাগানের কাছেই দেখলাম গলফ কোর্স। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লাগলো।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের যেকোনো স্থান থেকে ট্রেনে বা সড়কপথে সরাসরি শমশেরনগর আসা যায়। ঢাকা থেকে আন্তঃনগর উপবন ট্রেনে সরাসরি শমশেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে নামা যাবে। এ ছাড়া আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে সাত কিলোমিটার দূরের ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশনে নেমেও আসতে পারেন শমশেরনগর। আন্তঃনগর পারাবত ট্রেনে শ্রীমঙ্গল অথবা কুলাউড়া স্টেশনে নেমেও আসা যাবে। 


সুমন্ত গুপ্ত    এস এম