পাহাড়-উপত্যকাজুড়ে মেঘ আর সবুজের সমারোহের মধ্যে অবস্থিত ঝান্ডির কথা শুনেছিলাম বেশ আগেই। তাই ডুয়ার্স ভ্রমণে গিয়ে মাত্র ৫০ কিমি দূরে এই অতি সুন্দর জায়গাটায় ঢুঁ না দিতে মন সায় দিচ্ছিল না। ডুয়ার্সে ভ্রমণ পালা শেষ করে বাক্সপেটরা নিয়ে হাজির হলাম মেঘের বাড়ি খ্যাত ঝান্ডি তে (Jhandi)। জাগতিক একঘেয়েমি থেকে মুক্তির জন্য ঝান্ডির বৈচিত্র্যময়তা দিতে পারে অখণ্ড মুক্তির স্বাদ।
ডুয়ার্স থেকে ঝান্ডির দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার হলেও উচ্চতা বেশ বেশি। ঝান্ডি ইকো রিসোর্টে বেশ কয়েকটা কটেজ আছে।
সর্বমোট ৩৫ জন থাকতে পারে। পাহাড়ের উঁচু-নিচু ধাপগুলোতে অবস্থিত এই কটেজগুলো। রিসোর্টের ঠিক সামনেই চা বাগান।
সমস্ত ডুয়ার্স-ঝান্ডিজুড়েই এমনই চা বাগানের আধিক্য ছড়িয়ে আছে, তার মধ্যে রিসোর্টটিকে মনে হচ্ছিল চা বাগানের মধ্যখানে একটু নিবাস। একটু দূরেই পাইন কাঠের তৈরি ভেতরকার ডেকোরেশনে গোছানো এবং ছিমছাম ডাইনিং। আড্ডা দেয়ার জন্য খুব সুন্দর জায়গা।
ঝান্ডি ভিউ পয়েন্টটা আমাদের কটেজের একটু উপরে। জঙ্গলের পথ ধরে সোজা নিচের দিকে ৪-৫ কিলোমিটার হাঁটলে সামনে পড়বে গীত ঝোড়া। এখানে তিস্তার পানিতে পা ডুবিয়ে বন জঙ্গলে কিছুটা অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না।
প্রত্যেক জায়গার খাবারের কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানে দেখা যায়, সাধারণ বাঙ্গালি খাবার ভাত হলেও এরা ভাতের সাথে পাঁপরভাজা খায়। ঝান্ডি ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ালে পাহাড়ের নিচে খরস্রোতা বহমান তিস্তার দেখা মেলে। তবে এটা ঠিক কত নিচে তা বলা মুশকিল।
রিসোর্টের আশেপাশে এবং চা বাগান ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা নেমে এলো। পাহাড়ি মেঘ ঢাকা জায়গা বলে সন্ধ্যেও নামে কিছুটা তাড়াতাড়ি। রাত্রির আগমনকে বরণ করে নিতে ডাইনিং-এ পাওয়া গেল পাকোড়া আর চা। পাহাড়ের এসব হোম স্টেতে বা রিসোর্টে রাতের খাবার বেশ তাড়াতাড়ি।
আট বা সাড়ে আটটার মধ্যে রাতের খাবার পালা শেষ।
শীতের কারণে এরপর আর তেমন কিছু করার নাই। রাতে আলো জ্বেলে রাখা মানেই পোকা। এখানে বিচিত্র সব পোকা আর প্রজাপতি। অবশ্য একটু কষ্ট করে রাত জাগলে সবচেয়ে সুন্দর জিনিসের দেখা মেলে এখানে।
অন্ধকার গাঢ় হবার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে জোনাকির আলো আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটা শব্দ। আকাশ পরিষ্কার হবার সাথে সাথে অন্ধকারে দূরের পাহাড়ে অবস্থিত বসতির আলোও চোখে পড়ল।
পরের দিন সকালে স্থানীয় একজন জানিয়েছিল সকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে ওই দূরের পাহাড়ের পেছনেই নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা উঁকি দেয়।
আমরা বোধহয় ততোটা ভাগ্যবান নই তাই পরেরদিন সোনার পাহাড় না দেখেই ক্যালিংপঙ যেতে হয়েছিল। তবুও এক দিনের এই ঝান্ডি দর্শন অনেক দিন মনে থাকবে এই অদ্ভুত সুন্দর মেঘে ঢাকা পাহাড়ি উপত্যকা এবং প্রকৃতির জন্য।
এখানে থাকার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এই রিসোর্ট। কটেজ প্রতি ভাড়া ৩,০০০-৩,৫০০ রূপি। প্রতি কটেজে তিন রুম তাই গ্রুপে ৫-৬ জন থাকলে সাশ্রয়ী হবে কারণ ভাড়া নিতে হলে পুরো কটেজই নিতে হয়।
যেভাবে যাবেন :
রিসোর্টের নিজস্ব পরিবহন সুবিধা আছে। আগে থেকে কথা বলে রাখলে এরাই আপনাকে নিয়ে আসবে রিসোর্টে। এছাড়া জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়ি থেকে শেয়ারে জিপ পাওয়া যায়।
গ্রুপে ৫-৬ জন হলে এক জিপেই যাবেন এখানে। এখানে আসার জন্য অক্টোবর বা নভেম্বর মাসই বেশি উপযুক্ত হলেও সারাবছরই বিভিন্নরকম প্রকৃতির দেখা মেলে।
বি:দ্র: যেকোনো জায়গায় ঘুরতে গেলে সেখানকার অধিবাসীদের ক্ষতি হয় এবং পরিবেশ দূষিত হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা আমাদের দায়িত্ব।