ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান (দ্বিতীয় অংশ)

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ইতিহাস সমৃদ্ধ ঢাকার পুরাকীর্তি এবং ঐতিহ্যের সম্ভার সম্পর্কে জেনে নিন

ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান” এর প্রথম অংশে আমরা ঢাকার ১৫টি ঐতিহ্যবাহী ও নান্দনিক স্থান সম্পর্কে জেনেছি। “ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান” শীর্ষক লেখার দ্বিতীয় পর্বে আমরা আরও ১১ টি ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জানবো।

১. সোহরাওয়ার্দী উদ্যান


সোহরাওয়ার্দী উদ্যান

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে জড়িত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান; ছবি : সংগৃহীত


 সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকার রমনা থানায় অবস্থিত একটি সুপরিসর নগর উদ্যান, যা পূর্বে রমনা রেসকোর্স (Race Course) ময়দান নামে পরিচিত ছিল। এবং এখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর প্রতি রবিবার ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। এটি পূর্বে ব্রিটিশ সৈন্যদের সামরিক ক্লাব ছিল। এছাড়াও এটি রমনা ঘোড়দৌড়ের মাঠ ও রমনা শরীরচর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখানেই "জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান" ৭ ই মার্চের ভাষণ প্রদান করেন এবং এই উদ্যানেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। যার কারণে এই স্থানটি জাতীয় স্মৃতিচিহ্নও বটে।

২. জিনজিরা প্রাসাদ
জিনজিরা প্রাসাদ ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি। সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর শরফুন্নেছা, সিরাজের মা আমেনা, খালা ঘষেটি বেগম, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা ও তার শিশুকন্যা সবাইকে ঢাকার এই জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। এই জিঞ্জিরা প্রাসাদে তারা বেশ কিছুদিন বন্দী জীবন যাপন করার পর মীরনের নির্দেশে ঘষেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে নৌকায় করে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়। ক্লাইভের নির্দেশে শরফুন্নেছা, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং তার শিশুকন্যা রক্ষা পান এবং তাদেরকে মুর্শিদাবাদে পাঠানো হয়। জিঞ্জিরা প্রাসাদ ইতিহাসের চিহ্ন বহন করছে যেখানে আপনি দর্শনার্থী হিসেবে ঘুরে আসতে পারেন।

আরও পড়ুন : ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান (প্রথম অংশ)

৩. বিউটি বোর্ডিং

বিউটি বোর্ডিং

একসময় দেশের গুণী শিল্প সাহিত্যিকদের আড্ডাস্থল ছিলো এই বিউটি বোর্ডিং; ছবি : উইকিপিডিয়া


বিউটি বোর্ডিং পুরনো ঢাকার বাংলা বাজারে ১নং শ্রীশদাস লেনে অবস্থিত। এটি একটি দোতলা পুরাতন বাড়ি যার সাথে বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস জড়িত। এর নামকরণ করা হয় প্রলহাদ চন্দ্রের মেয়ের নামানুসারে। এটি ছিল বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গুণী মানুষদের আড্ডার একটি কেন্দ্রস্থল। তাই একে ইতিহাসের ভিত্তিভূমি বলা হয়। ১৯৪৭ সালে এই বোর্ডিং এর যাত্রা শুরু হয়েছিল।এটি পূর্বে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “সোনার বাংলা” পত্রিকার অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখানে আড্ডা দিতে আসতেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান সহ অনেকেই।

৪. রূপলাল হাউজ
রূপলাল হাউজ ঊনবিংশ শতকের ষাটের দশকে বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর পারে পুরানো ঢাকার শ্যামবাজার এলাকায় জমিদার ও বণিকদের দ্বারা নির্মিত একটি ভবন। এটি একটি ৯১.৪৪ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট দুইতলা ভবন। রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস নামের দুই ভাই ভবনটি নির্মাণ করেন। এটি দুইটি ভিন্ন অংশে বিভক্ত যার প্রতিটিতে কিছুটা ভিন্ন স্থাপত্য শৈলী দেখা যায়। 'কোরিনথীয়' রীতিতে ভবনটির ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এর উপরে রয়েছে রেনেসাঁস কায়দায় নির্মিত 'পেডিমেন্ট'(Pediment)। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভক্ত হলে রূপলালের উত্তরাধিকাররা ভারতের পশ্চিম বঙ্গে চলে যান। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

আরও পড়ুন : ঢাকা থেকে এক দিনের ট্যুর স্পট সমূহ : পর্ব ১

৫. শায়েস্তা খা'র মসজিদ
পুরনো ঢাকায় অবস্থিত শায়েস্তা খাঁর মসজিদ একটি অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। আকারে ছোট এই মসজিদটি বুড়িগঙ্গা নদীর পাশেই মিডফোর্ড হাসপাতালের পিছনে অবস্থিত। ঢাকা শহরে শায়েস্তা খাঁর সুবেদার হিসেবে আসার পরে তিনি বিভিন্ন ইমারত নির্মাণ করেন, এছাড়াও তিনি তার নিজে থাকার জন্য মিডফোর্ড এলাকায় ইমারত ও মসজিদ নির্মাণ করেন। বলা হয়ে থাকে যে, শায়েস্তা খাঁ প্রথম যখন ঢাকায় সুবেদার হিসেবে এসেছিলেন তখন এই মসজিদটি তৈরি করা হয়েছিল। বিশ শতকের প্রথম দিকে মসজিদটি পুড়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা পুনর্নির্মাণ করা হয়।

৬. লালকুঠি নর্থব্রুক হল
লালকুঠি নর্থব্রুক হল ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ওয়াইজ ঘাটে অবস্থিত অন্যতম প্রাচীন ও নান্দনিক স্থাপত্যের একটি নিদর্শন। এটি বর্তমানে স্থানীয়দের কাছে লালকুঠি নামে পরিচিত। ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যরিং নর্থব্রুক ১৮৭৪ সালে ঢাকা সফরে এসেছিলেন। তার এ সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই ভবনটি টাউন হল হিসেবে নির্মাণ করা হয়। তখনকার ঢাকার স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা গভর্নর জেনারেল নর্থব্রুকের সম্মানে এই ভবনের নাম নর্থব্রক হল রাখেন।এখানেই ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকা পৌরসভা সংবর্ধনা দেয়া হয়। এখানে একটি নাট্যালয় এবং মূল ভবনের পিছনের দিকে একটি গ্রন্থালয় রয়েছে। জরাজীর্ণ এই ভবনটি বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে রয়েছে।

আরও পড়ুন : পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং : সুমন্ত গুপ্তের ভ্রমণ গল্প
৭. কাস্বাবটুলী মসজিদ


কাস্বাবটুলি_মসজিদ

ছবিতে চিনির টুকরা মসজিদ বা কাস্বাবটুলী মসজিদ; ছবি : উইকিমিডিয়া


 কাস্বাবটুলি জামে মসজিদ,স্থানীয়দের নিকট এটি ‘চিনির টুকরা মসজিদ’ নামে পরিচিত।এটি পুরান ঢাকার কসাইটুলির পিকে ঘোষ রোডে অবস্থিত। এই মসজিদটির সঠিক স্থাপনার সময়কাল জানা যায় নি। ধারণা করা হয় এই মসজিদটি প্রায় একশত বছরের পুরনো। কারও মতে, এটি ১৯০৭ সালে নির্মাণ করা হয়েছে। আবার অনেকে বলে এটি ১৯১৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদটির গায়ে রয়েছে সাদা রঙের চিনামাটির টুকরা যা দেখতে চিনির দানার মতো। মূলত এই কারণেই স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদটিকে চিনির টুকরা মসজিদ বলে ডাকেন।

৮. বিনত বিবির মসজিদ
বিনত বিবির মসজিদ পুরানো ঢাকার নারিন্দা পুলের উত্তর দিকে অবস্থিত। এটি একটি মধ্যযুগীয় মসজিদ। এই মসজিদটির গায়ে শিলালিপি খুদিত রয়েছে। এবং এই শিলালিপি অনুসারে বিশেষজ্ঞদের মতে ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে তার কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করেন।

৯. খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ
খান মোহাম্মদ মৃধার মসজিদ পুরানো ঢাকার আতশখানায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ যা ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে নায়েবে নাযিম ফররুখশিয়ারের শাসনামলে নির্মিত হয়।ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের মতে ঢাকার প্রধান কাজী ইবাদুল্লাহের আদেশে খান মোহাম্মদ মৃধা এটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এই মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্বে রয়েছে ।

আরও পড়ুন : নান্দনিক স্থাপত্যের বায়তুর রউফ মসজিদ : ঢাকা

১০. শহিদ মিনার

শহিদ মিনার

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের স্বারক চিহ্ন কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার; ছবি : সংগৃহীত


 কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ঢাকার রমনা থানায় অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কিছুটা পাশেই অবস্থিত। এটি ঢাকার একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।এটি ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে তৈরি করা হয়েছে। প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে এখানে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয় এবং ফুল দেয়ার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

১১. জাতীয় স্মৃতিসৌধ
জাতীয় স্মৃতিসৌধ ঢাকা থেকে উত্তর-পশ্চিমে সাভারে অবস্থিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান শহীদদের অসামান্য ত্যাগ ও তাদের অবদানের স্মৃতি হিসেবে সৌধটি তৈরি করা হয়েছে। সাতটি ত্রিভুজাকৃতির উঁচু ও স্বতন্ত্র প্রাচীর নিয়ে মূল সৌধটি গঠিত। স্থাপনাটি ৪৫.৭২ মিটার উঁচু। স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন স্তম্ভটি এমনভাবে নকশা করেছেন যে, ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে একে ভিন্ন ভিন্ন অবকাঠামোয় দেখা যায়। এছাড়াও এখানে মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের দশটি গণকবর রয়েছে। সরকারিভাবে বিদেশী রাষ্ট্রনায়কগণ বাংলাদেশ সফরে আসলে তাদেরকে এই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আসতে হয়।  

আনিসুর রহমান