ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : এশিয়া মহাদেশ (জাপান পর্ব)

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জাপানের ২৩টি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যর স্মারক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে ইউনেস্কো



জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য, যোশিনোয়ামা

নান্দনিক জাপানের নয়নাভিরাম শহরগুলোর একটি যোশিনোয়ামা। ছবি : গেটি ইমেজ


 সূর্যোদয়ের দেশ নামে পরিচিত সে দেশ। সারা বিশ্বের কাছে যারা আদর্শ প্রযুক্তিগত খাতে কিংবা উন্নয়নের খাতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত হলেও জাপান বর্তমানে বিশ্বের বড় কিছু অর্থনৈতিক শক্তির একটি। নিপাট সাজানো গোছানো এই দেশটির রয়েছে হাজার হাজার বছরের পুরাতন ঐতিহ্য। পর্যটকদের জন্য জাপান বেশ আগ্রহের জায়গা সবসময়ের জন্যই। প্রকৃতি এবং মানুষের মেলবন্ধনে জাপান নিজেকে নিজেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর জাপানে দর্শনীয় ও ঐতিহ্যগত স্থানের অভাবও নেই খুব একটা। এখন পর্যন্ত দেশটির মোট ২৩টি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে ইউনেস্কো। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যে জাপানের ঐতিহ্যবাহী তেমন কিছু স্থানের পরিচিতি থাকছে এই পর্বে।


জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য, হিমেজি প্রাসাদ

হিমেজি প্রাসাদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


হিমেজি প্রাসাদ  হিয়োগো অঞ্চলের এই হিমেজি প্রাসাদ জাপানের সবচেয়ে দর্শনীয় কিছু জায়গার মাঝে অন্যতম। ২০১৫ সালে এই স্থাপনার ৫ বছরের সংস্কার কাজ শেষে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সংস্কারকাজের ক্ষেত্রে জাপান সরকার এর আদি ঐতিহ্য এবং মূল গঠনের সম্পূর্ণ অংশ অক্ষত রেখেছে। ১৯৯৩ সালে হিমেজি প্রাসাদ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ বলে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। হিমেজি প্রাসাদের মূল প্রাসাদ ভবনটি জাপানের রাজতন্ত্রের শেষ ১২টি স্থাপনার মাঝে অন্যতম। জাপান সরকার একে দেশটির ন্যাশনাল ট্রেজার হিসেবে ঘোষণা করেছে।


জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য, হিমেজি প্রাসাদ

হিমেজি প্রাসাদ। ছবি : সংগৃহীত


হিমেজি প্রাসাদের মাঝে যেকোনো দর্শনার্থী জাপানের নিজস্ব এবং প্রাচীনতম স্থাপত্যকলার সবটা খুঁজে পাবেন। জাপানের উৎপত্তি এবং বিকাশ সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে এই স্থাপনা ভ্রমণ যে কারো জন্য আবশ্যক বলা চলে। এছাড়া প্রাসাদের আশাপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো রয়েছেই।

হিস্টোরিক মনুমেন্ট অফ কিয়োটো 

জাপানের স্থাপত্য এবং সংস্কৃতির পরিচয় যদি হিমেজিতে পেয়ে থাকেন তবে দেশটির ইতিহাস এবং সভ্যতার পথে বিকাশ জানার জন্য আপনাকে যেতে হবে প্রাচীন শহর কিয়োটোতে। কিয়োটো শহরের হিস্টোরিক মনুমেন্ট বা ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আপনাকে জানান দিবে প্রাচীন জাপানের অনেক অজানা দিক।


জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য, কিয়োটোর ঐতিহাসিক স্থাপনা

কিয়োটোর ঐতিহাসিক স্থাপনা। ছবি : সংগৃহীত


জাপানের কিয়োটো, উজি এবং অটসু শহরের সতেরটি আলাদা আলাদা জায়গা মিলে প্রাচীন কিয়োটোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউনেস্কো। এখানে আছে বৌদ্ধ মন্দির, ১২টি বাগান এবং নিজো প্রাসাদের মত চোখ জুড়ানো জায়গা। খ্রিস্টীয় ৮ম শতক থেকে ১৭শ' শতক পর্যন্ত জাপানের মূল সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্র ছিল এই কিয়োটো শহরটি। খ্রিস্টপূর্ব ৭৯৪ সালে চীন শাসিত জাপানে কিয়োট শহরের জন্ম হয়। জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত এটিই ছিল জাপানের রাজধানী। কিয়োটো শহরের বিভিন্ন আনাচে কানাচে তাই জাপানের আভিজাত্য ফুটে উঠে সাবলীল ভঙ্গিতে।



জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য , কিয়োটো

কিয়োটো। ছবি : সংগৃহীত



ইয়াকুশিমা

অসুমি দ্বীপপুঞ্জের এক অসাধারণ প্রাকৃতিক অঞ্চল ইয়াকুশিমা। জাপানের একেবারেই দক্ষিণ প্রান্তের কিয়ুশু থেকে এর দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। এটি পাহাড় আর বনে পরিপূর্ণ এক দ্বীপ। ইউনেস্কো একে জীববৈচিত্র্য, বৈজ্ঞানিক এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।


জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য , ইয়াকুশিমা জঙ্গল

ইয়াকুশিমা জঙ্গল। ছবি : সংগৃহীত


ধারণা করা হয়, ইয়াকুশিমাতে বিদ্যমান বনাঞ্চলের বয়স ১০০০ বছরের কাছাকাছি এবং এতে বিদ্যমান বাস্তুতন্ত্র প্রায় ১ হাজার ৯০০টি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি এবং উপ-প্রজাতির সমন্বয়ে গঠিত। ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের দরুণ এই অঞ্চলে বছরে প্রায় ৮,০০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত ঘটে। সেইসাথে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও থাকে অধিক মাত্রায়। যার কারণেই এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে এক অনন্য জীববৈচিত্র্য।


জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য, ইয়াকুশিমা জঙ্গলের একটি পথ

ইয়াকুশিমা জঙ্গলের একটি পথ। ছবি : সংগৃহীত



ইতসুকুশিমা শিন্তো মন্দির

ইন্টারনেটে জাপান নিয়ে একটুও যদি জানার আগ্রহ থাকে তবে, প্রথমেই যেই ছবিটি চোখের সামনে আসবে তা ইতসুকুশিমার শিন্তো মন্দির। বিশেষত সাগরের মাঝে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই গেটটি জাপানের প্রতিচ্ছবি বলা চলে। এটি জাপানের ঐতিহ্য, সৌন্দর্য এবং জাপানের শিন্তো ধর্মের ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।


ইতসুকুশিমা শিন্তো মন্দির

ইতসুকুশিমা শিন্তো মন্দির। ছবি : উইকিপিডিয়া


 শিন্তো জাপানের ধর্মীয় এক বিশ্বাস, যেখানে সমুদ্র এবং ঝড়ের দেবতা সুজানো-নো-মিকোতো। এবং এই দেবতার কন্যাদের প্রতি উৎসর্গ করেই নির্মিত হয়েছে এই তোরণটি। শিন্তো ধর্মের অন্যান্য স্থাপনার মত এটিও মিসেন পর্বতের কাছাকাছি অবস্থিত। শিন্তো মূলত এই অঞ্চলের পবিত্র ধর্মের ন্যায়। মূল তোরণটির বয়সে বেশ প্রাচীন। খ্রিস্টীয় ৬ শতকে ইতসুকুশিমার এই তোরণটি নির্মাণ করা হয়। যদিও বর্তমানে যেসব স্থাপনা চোখে পড়ে তার ভিত্তি স্থাপন করা হয় ১২শ' শতকে। বিখ্যাত যোদ্ধা তাইরা নো কিয়ামোরি এটি নির্মাণ করেন।


শিরেতোকো

শিরেতোকো। ছবি : উইকিপিডিয়া



শিরেতোকো

জাপানি শব্দ শিরেতোকো এর বাংলা করলে দাঁড়ায় 'যেখানে পৃথিবীর জন্ম'। আক্ষরিক অর্থে এমন অদ্ভুত নাম হলেও প্রাকৃতিক দিক বিবেচনায় শিরেতোকো আসলেই পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য। শিরেতোকো ন্যাশনাল পার্কের অবস্থান জাপানের হোক্কাইডো শহরের একেবারে উত্তর প্রান্তে। ইয়াকুশিমার মতই এই অঞ্চলেরও একেবারেই নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র রয়েছে। রয়েছে স্বতন্ত্র আবহাওাগত বৈশিষ্ট্য। শিরেতোকো পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টি সমৃদ্ধ পানির উৎস হিসেবে গণয় করা হয়। উত্তরের অহোৎস্কু সাগরের বরফ গলা পানি থেকেই আসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পুষ্টিমান সমৃদ্ধ পানি। জাপানের বাদামি ভাল্লুক, সিকা ভাল্লুকসহ নানা বিরল প্রজাতির প্রাণীর শেষ বাসস্থান হিসেবে টিকে আছে শিরেতোকো ন্যাশনাল পার্ক।


শিরাকাওয়া-গো ও গোকায়ামার ঐতিহাসিক গ্রাম

শিরাকাওয়া-গো ও গোকায়ামার ঐতিহাসিক গ্রাম। ছবি : সংগৃহীত


 জাপান মূলত একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। প্রধান চারটি দ্বীপের মাঝে আয়তনে সবচেয়ে বড় হনসু। এই হনসু দ্বীপের ঠিক মাঝামাঝি অবস্থান করছে 'দ্য হিস্টোরিক ভিলেজ'। দ্য হিস্টোরিক ভিলেজ বা ঐতিহাসিক গ্রাম মূলত প্রাচীন জাপানের মেনে চলা তিনটি গ্রামকে নির্দেশ করে। মূলত এই অঞ্চলে তিনটি গ্রামের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য। শিরাকাওয়া-গো অঞ্চলের 'ওগিমাচি', এবং গোকায়ামা অঞ্চলের দুই গ্রাম 'আইনোকুরা' এবং 'সুগানুমা'। জাপান শিল্প এবং অন্যান্য খাতে ব্যাপক উন্নতি করলেও এই তিনটি গ্রাম এখন পর্যন্ত প্রাচীন জাপানের সবটুকু ধরে রেখেছে। এখন এসব গ্রামে বাড়িগুলো 'গাসসো জুকুরি' বা প্রার্থনারত হাত নামের একটি নিজস্ব প্রথায় নির্মিত। এতে খড়ের ছাউনি এতটা ঢালু করা হয় যা দেখতে প্রার্থনার সময় কনুই থেকে দুই হাতের অবস্থান মনে করিয়ে দেয়।


শিরাকাওয়া-গো ও গোকায়ামার ঐতিহাসিক গ্রাম

শিরাকাওয়া-গো ও গোকায়ামার ঐতিহাসিক গ্রাম। ছবি : সংগৃহীত


 জলবায়ুগত এবং ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই এই তিন গ্রামের রীতিনীতি প্রাচীন যুগ থেকেই অন্য সবকিছু থেকে আলাদা। অধিবাসীরা এখনো জাপানের প্রাচীন পন্থায় জীবনযাপন করেন। এবং জীবিকার জন্য সেরিকালচার কিংবা কাগজ উৎপাদনের মত কাজ এখানে প্রচলিত। সবমিলিয়ে এই তিনগ্রামের ১১৭টি বাড়ি রয়েছে বর্তমানে।


ফুজিসান

মাউন্ট ফুজিয়ামা বা ফুজিসান। জাপানের আরেকটি বৈশ্বিক পরিচিত স্থান বলা চলে। ফুজিয়ামা পর্বতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হননি এমন মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। মাউন্ট ফুজিয়ামার আশপাশের মোট ২৫টি স্পট মিলে পুরো পর্বতকেই ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই ২৫টি জায়গার মাঝে আছেন পর্বতের লাভামুখে অবস্থিত অসাধারণ এক শিন্তো মন্দির, সেই সাথে তীর্থযাত্রিদের অস্থায়ী আবাসগুলোও দেখার মতো।


জাপান বিশ্ব ঐতিহ্য, ফুজিসান

ফুজিসান। ছবি : সংগৃহীত


 ১৮শ' শতক থেকেই মাউন্ট ফুজিয়ামা বৌদ্ধধর্ম এবং শিন্তোধর্ম দুই ধর্মের ক্ষেত্রেই এক পবিত্র স্থান বলে বিবেচ্য। একটা সময় এই পাহাড়ের উঠার আগে তীর্থযাত্রীরা এর আশপাশের আটটি লেক সম্পূর্ণ একবার করে প্রদক্ষিণ করতেন। আর জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতিতেও এর ভূমিকা রয়েছে বিস্তৃত আকারে। সবচেয়ে বড় কথা, সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সূর্যটা এই ফুজিয়ামা পর্বতের দিক থেকেই উওদয় হয়। এমন সৌন্দর্য চোখে দেখতে পাওয়াটাও প্রশান্তির।  

জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম