গালওয়ান : চীন-ভারত যুদ্ধ চলছে যে উপত্যকা নিয়ে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কিংবদন্তি ও পর্বতারোহী গুলাম রসুল গালওয়ান-এর নামেই নামকরণ করেছিল ব্রিটিশরা



নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের গালওয়ান উপত্যকা

নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের গালওয়ান উপত্যকা। ছবি : টাইমস অফ ইন্ডিয়া


 আন্তর্জাতিক খবরে এই মুহূর্তে আলোচিত একটি নাম 'গালওয়ান উপত্যকা'। এই উপত্যকা নিয়ে চীন ও ভারত জড়িয়ে পড়েছে সংঘর্ষে। দুই দেশই জায়গাটি নিজেদের বলে দাবি করছে। আলোচিত এই গালওয়ান উপত্যকাটি কীভাবে এলো এবং কী আছে সেখানে তা নিয়েই আজকের লেখা।

গালওয়ান উপত্যকা  

গালওয়ান উপত্যকার অবস্থান লাদাখের একদম মাঝ বরাবর। লাদাখ ভারতের কাছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও এর বড় একটি অংশ বেশ আগে থেকে চীনের দখলে। 'আকসাই-চীন' নামে পরিচিত এই জায়গাটির আয়তন প্রায় ১৪ হাজার বর্গমাইল। জায়গাটির ওপর ভারতের দাবি বেশ আগে থেকেই। আবার ১৯৫৯ সাল থেকে এই অঞ্চলকে নিজেদের দাবি করে আসছে চীন। ১৯৬২ সালে ভারত এখানে সেনাছাউনি বানালেও ভারত-চীন যুদ্ধ শুরু হলে চীন এই অঞ্চল দখল করে নেয়। লাদাখের পাহাড় আর পাথুরে এক ল্যান্ডস্কেপের মধ্য দিয়ে প্রবহমান গালওয়ান নদীর উৎস কারাকোরাম পর্বতমালায়। এই পর্বতমালা আবার পাকিস্তানের গিলগিট-বেলুচিস্তান, ভারতের লাদাখ এবং চীনের জিনজিয়ান প্রশাসনিক অঞ্চল জুড়ে অবস্থিত। আকসাই চীন ও পূর্ব লাদাখের মধ্য দিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটারজুড়ে গালওয়ান নদী প্রবাহিত হয়ে মিশেছে সিন্ধুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী শিয়ক নদীতে।


গালওয়ান উপত্যকা।

গালওয়ান উপত্যকা। ছবি : টাইমস অফ ইন্ডিয়া


নাম শুনতে যতই ভাল লাগুক, অথবা সেখানে যেতে ভ্রমণপ্রিয়দের মন টানুক না কেন, চাইলেই সেখানে যাওয়া যাবে না। কারণ গালওয়ানে প্রবেশে রয়েছে কঠিন নিষেধাজ্ঞা। এখানে শুধু আর্মিদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। গালওয়ানের আগে প্যাংগং লেক পর্যন্ত যাওয়া যায়। ভারতের লাদাখ ও চীনের রুতোশ প্রদেশের সীমান্তে হিমালয়েরই একটি লেক এই প্যাংগং। এই লেকের প্রায় ৬০ শতাংশ তিব্বতে অবস্থিত। এই লেক নিয়েও ভারত ও চীনের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

প্যাংগংকে বলা হয় ১৪ হাজার ফুট ওপরে হাজার হাজার রুক্ষ পাহাড় আর মরুভূমির মধ্যে অবস্থিত বিধাতার এক বিশেষ আশীর্বাদ। এই লেকটি পাহাড় ও ভূমি দিয়ে আবৃত একটি বেসিন বা জলাশয় মাত্র। প্যাংগং লেক ও এর আশপাশের অঞ্চলের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৫-১০ ডিগ্রি, যেটা শীতে কখনো ২০-২৫ ডিগ্রি বা তার চেয়েও বেশি হয়। একই অবস্থা গালওয়ান উপত্যকারও। শীতের সময় প্রচণ্ড শীতে সেখানে টেকা দায়। এই এলাকায় সবুজের কোনো চিহ্ন নেই। এখানে কোনো ঘাসও জন্ম নেয় না।

লাদাখ ও সিল্করুট

গালওয়ান নিয়ে জানতে হলে এর সাথে সিল্করুটের সম্পর্কটা নিয়েও জানা জরুরি। প্রাচীনকাল থেকে সিল্ক ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই সিল্ক রুটে যাত্রা শুরু হয়। আজ থেকে প্রায় এক হাজারেরও বেশি বছর আগে লাদাখের মধ্য দিয়ে চা, ক্রিম, ঘি, পশম, সিল্ক, লবণ, শস্যদানা, নীল ইত্যাদির মতো পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো। কাশ্মীর কিংবা পাঞ্জাব, মধ্যপ্রাচ্য, তিব্বত, মধ্য এশিয়ায় সিল্ক রুট হয়ে প্রতিটি পণ্য পৌঁছে যেত। তাই এই সিল্ক রুটের পথে লাদাখ ছিল অন্যতম একটি বাণিজ্য কেন্দ্র।


লাদাখ

লাদাখ। ছবি : সিএনট্রাভেল


বাণিজ্য ঠিকঠাকভাবে চললেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই লাদাখে ক্ষমতাবিস্তারের জন্য শুরু হয় রাজনৈতিক টানাপড়েন। লাদাখের রয়্যাল নামগাল বংশের রাজাদের হারিয়ে কাশ্মীরের রাজা গুলাব সিং রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও তা শেষ পর্যন্ত চলে যায় ব্রিটিশ শক্তির হাতে। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়াও হাত বাড়ায় লাদাখের দিকে। লাদাখের অধিকাংশ এলাকা তখন অনাবিষ্কৃত থাকায় শুরু হয় দুর্গম অঞ্চলগুলোতে অভিযান, নতুন রাস্তার সন্ধান এবং আধিপত্য স্থাপনের কাজ। শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানো হতো লাদাখের অধিবাসীদেরই। চলত লাদাখের গ্রামগুলোতে লুটতরাজ।

উপত্যকার নামকরণ

উপত্যকার সবচেয়ে কাছের লেহ শহরের একজন কিংবদন্তি ও পর্বতারোহী গুলাম রসুল গালওয়ানের নামে রাখা হয়েছে এই উপত্যকার নাম। ব্রিটিশ আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও একজন স্থানীয় ব্যক্তির নামে উপত্যকার নামকরণ বেশ অবাক করার মতই ঘটনা বটে। কাশ্মীরি ভাষায় 'গালওয়ান' শব্দের অর্থ হলো ডাকাত। উনিশ শতকে গুলাম রসুল গালওয়ানের পিতামহ কারা গালওয়ান ছিলেন কাশ্মীরে বিখ্যাত এক দস্যু।


স্যাটেলাইট থেকে গালওয়ান উপত্যকা

স্যাটেলাইট থেকে গালওয়ান উপত্যকা। ছবি : সিএনএন


 ধনীদের সম্পদ লুট করে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার জন্য তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। তিনি কাশ্মীরের মহারাজার ঘরে ঢুকে তার গলায়ও ছুরি ধরেছিলেন। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তার ফাঁসি হয়। তার পরিবার পালিয়ে যায় লাদাখে। দরিদ্রতার মাঝে ১৮৭৮ সালে জন্ম হয় গুলাম রসুল গালওয়ানের। অভাব মেটাতে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের সঙ্গে নানা অভিযানে শামিল যুক্ত হন। ব্রিটিশ অফিসার কিংবা বণিকদের মালবহন, পশুর পাল পৌঁছে দেয়া, অশ্ব-পরিচালনা এসব কাজই করতেন বেশি। কাজের বিনিময়ে কখনও পেতেন অর্থ, কখনও খাবার। এভাবেই যাচ্ছিল সময়। ১৮৯২ সালে একটি ঘটনায় গুলাম রসুলের জীবন বদলে যায়। একটি ব্রিটিশ দলের অভিযানে পথপ্রদর্শক হয়ে সঙ্গ দেয়ার সুযোগ আসে।


চীন-ভারতের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব লাগে এই গালওয়ান উপত্যকায়

চীন-ভারতের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব লাগে এই গালওয়ান উপত্যকায়। ছবি : আইবিজি


 চার্লস মারে (সেভেন্থ আর্ল অব ডানমোর) এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট আজকের গালওয়ান নদীর উৎস খুঁজে বের করে সমগ্র অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করার উদ্দেশে বের হন। তখনও তার নাম গালওয়ান হয়নি। তা কেবল পরিচিত ছিল শিয়ক নদীর একটি উপনদী হিসেবে। দুর্গম প্রাকৃতিক পরিবেশে তারা রাস্তা হারিয়ে ফেলছিলেন বারবার। গন্তব্য থেকে সরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পথ হারিয়ে ফেলে তাদের ক্যারাভ্যান। হতাশায় জর্জরিত হয়ে পড়েন সবাই। ভেবেছিলেন এই রাস্তা থেকে বেঁচে ফেরার হয়তো আর কোনো উপায় নেই। আশা হারাননি ১৪ বছর বয়সী গালওয়ান। এলোমেলো গোলকধাঁধার মধ্যে পথ খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যান নদীর কাছে পৌঁছনোর সহজ একটি রাস্তা। কিশোর গালওয়ানের এমন দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে চার্লস মারে উপত্যকাটির নাম দেন 'গালওয়ান উপত্যকা'।

'সার্ভেন্ট অব সাহিবস'

গুলাম রসুল উর্দু, তুর্কি, লাদাখি, তিব্বতি, কাশ্মীরিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। এই দক্ষতার কারণে তিনি কাজ পেয়েছিলেন লেহতে নিযুক্ত ব্রিটিশ জয়েন্ট কমিশনারের ‘আকসকল’ বা প্রধান সহকারীর পদে। গালওয়ান উপত্যকার পাশাপাশি তিব্বত, ইয়ারকান্ড, পামির, কারাকোরাম ও আফগানিস্তানের বেশ কয়েকটি দুর্গম পথও খুঁজে বের করেছিলেন তিনি।


গুলাম রসুল গালওয়ান

গুলাম রসুল গালওয়ান। ছবি : রোর মিডিয়া


নিজের জীবনকাহিনী নিয়ে লিখেছেন বই 'সার্ভেন্ট অব সাহিবস'। ইংরেজিতে দক্ষ না হলেও শুধু প্রবল ইচ্ছাশক্তির কারণে বই লিখেছিলেন ইংরেজিতে। মার্কিন অ্যাডভেঞ্চার রবার্ট ব্যারেটের সঙ্গে এক অভিযানে বেরিয়ে সিরিয়াস ইংরেজি চর্চার শুরু হয় গুলাম রসুলের। রবার্ট ব্যারেটের স্ত্রী ক্যাথরিন ব্যারেট তার ভাঙা ভাঙা শব্দে ইংরেজিতে লেখা আত্মজীবনীর সম্পাদনা করেছেন প্রায় এক যুগ ধরে। বইটিতে তার নিজস্ব ভাষাই ধরে রাখা হয়েছে। ১৯২৩সালে বের হয় গালওয়ানের লেখা আত্মজীবনী : 'সার্ভেন্ট অব সাহিবস আ বুক টু রিড অ্যালাউড'। ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হয়ে ১৯২৫ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যু হয় গালওয়ানের।  

নাবিলা বুশরা   এস এম