ঐতিহ্যবাহী রূপকথার চিমনিতে চড়তে যেতে হবে তুরস্কের কাপ্পাডোসিয়া

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিস্ময়ে ভরা বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান

বিস্ময়কর রূপকথার চিমনি।  ছবি : সংগৃহীত

 তুরস্ক ভূখণ্ডে আনাতোলিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত কাপ্পাডোসিয়া শহর। প্রায় ৬০ লাখ বছর পূর্বে আরগিয়াস পাহাড়সহ হাসান ও গুল্লু পাহাড়ের ক্ষয় কৃত ধাতু, লাভা মিশ্রিত হয়ে কাপ্পাডোসিয়া তৈরি হয়েছিল। প্যাথলিক যুগ থেকে এখানে মানুষের বসবাস শুরু হয়। বিভিন্ন কৌতুহলময় ও আকর্ষণীয় বিষয়ের জন্য এটি পর্যটকদের জন্য সেরা স্থান। কাপ্পাডোসিয়া প্রায় অর্ধ-শুষ্ক অঞ্চল । এটি বেশি পরিচিত লাভ করেছে এর বৈশিষ্ট্য‌ময় রূপকথার চিমনি, মোচাকৃতি পাথরের গঠন, অতুলনীয় উপত্যকা যা অঞ্চলটির বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া যায়। কাপ্পাডোসিয়ার গুহার ভেতরকার মনোমুগ্ধকর হোটেল দেখে আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। রয়েছে শত শত বাতাসে ভাসমান রত বেলুন যেগুলো প্রতিদিন সকালে উদীয়মান হয়। প্রাচীন যুগের উপত্যকাসহ ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন আপনাকে বিমোহিত করবে।

ডেভরেন্ট ভ্যালি, কাপ্পাডোসিয়া। ছবি : সংগৃহীত

প্রথমেই বলা যাক রেড ভ্যালি বা লাল উপত্যকার কথা। এখানকার তীক্ষ্ণ বেলেপাথরের শৈলশিরাগুলো খুবই গাঢ় ঐশ্বর্যমণ্ডিত লাল আলোয় উদ্ভাসিত হয় প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময়। আপনি হাইকিং করতে চান বা না চান এখানে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য হলেও আপনাকে বিমোহিত হতে হবে। হাইকিং এবং সূর্যাস্ত দেখার জন্য আরেকটি আকর্ষণীয় জায়গা রোজ ভ্যালি। এখানে অতুলনীয় শৈলশিরা আকৃতির জায়গাগুলো সূর্যাস্তের সময় সাদার সাথে গোলাপি রং মিশ্রিত হয়ে এক আভা তৈরি করে। তীক্ষ্ণ ঢেউ খেলানো শৈলশিরাগুলো তৈরি হতে প্রায় হাজার বছর লেগে গিয়েছে।

সব সময় শৈলগুলোর এক পাশ সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল থাকে আর অন্যপাশে থাকে ছায়ামণ্ডিত। এখানে শুধুমাত্র উদ্ভাসিত শৈলশিরা দেখার জন্য নয়, পর্যটকদের কাছে আরও বেশি পরিচিতি লাভ করেছে খনিজ দ্রব্যের রং-এর জন্য। এখানে যে খনিজ দ্রব্য পাওয়া যায় সবই গোলাপি রঙের। তুরস্কে ভ্রমনাগত পর্যটকদের ঘুরার তালিকার প্রথম দিকে থাকে কাপ্পাডোসিয়ায় বাতাসে ভাসমানরত বড় বেলুন। এ যেন এক রূপকথার রাজ্যে এসে ভ্রমণ করার মতো। আপনি সূর্যোদয়ের সময় প্রায় শ'খানেক বেলুনের সাথে হাওয়ায় ভেসে বেড়াতে পারবেন। প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ বেলুনে উপভোগ্য ভ্রমণ করতে আসে। আকাশে ভাসমানরত বেলুনে ভ্রমণের জন্য এটি এক নম্বর জায়গা। কাপ্পাডোসিয়ার চমৎকার এ বিষয়টি সত্যিই অতুলনীয়।

লিঙ্গ আকৃতির অদ্ভুত পাথর, লাভ ভ্যালি। ছবি : আর্থ ট্রেকার্স

এবার বলা যাক অদ্ভুত এক উপত্যকার কথা যার নাম লাভ ভ্যালি। অবাক করার বিষয় হলো লাভ ভ্যালিতে পাথরগুলো সবই লিঙ্গ আকৃতির। শিশ্নের মতো আকারের জন্য জায়গাটির নাম দেয়া হয়েছে লাভ ভ্যালি বা ভালবাসার উপত্যকা। উপত্যকার শেষ খণ্ড ঢেউ খেলানো বেলেপাথর দেখে আপনি বিমোহিত হতে বাধ্য। কাপ্পাডোসিয়ার কাছে লাভ ভ্যালি থেকে উচাইজার দূর্গ পর্যন্ত যাওয়ার পথ আরেক অনন্য সুন্দর দৃশ্যপট। এখানের পথে যেতে যেতে পাথরের আকার দেখে মনে হবে পৃথিবীর বাহিরে অন্য এক পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পথটি প্রায় সমতল এবং দূর্গে পৌঁছতে প্রায় এক থেকে দুই ঘন্টা সময় লাগবে।

বাতাসে ভাসমানরত বেলুন যেন এক অন্যরকম জগৎ তৈরি করে। ছবি : পিউর ভেকেশন

এবার বলা যাক প্যাছাবেগ ভ্যালি নিয়ে যেটি খুবই জনপ্রিয় জায়গা। এর রূপকথার চিমনি আর অসংখ্য গুহার মধ্যকার ঘরবাড়ি পর্যটকদের উচ্ছ্বসিত করে তুলে। রূপকথার চিমনিগুলো রূপকথার রাজ্যের মতোই এক দৃশ্য তৈরি করেছে। আর এখানকার গুহাগুলো সম্পর্কেও একাধিক গল্প রয়েছে। বিভিন্ন পর্যটক গুহার ভেতর গল্পগুলো অনুসন্ধান করতে আসেন।

শত বছরের শিল্পকর্মের সংগ্রহশালা। ছবি : কাপ্পাডোসিয়া

আপনি যদি শত শত বছর পূর্বের ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম এবং গুহা দেখতে চান তাহলে আসতে হবে গোরেইমির ওপেন মিউজিয়ামে। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে পৌঁছতে। আর এখানের ভূমি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী।

ইহলারা ভ্যালি। ছবি : ডেস্টীনেশন এক্সপার্ট ট্রাভেল

 সূর্যাস্ত দেখার জন্য চমৎকার জায়গা হল ইহলারা ভ্যালি। এই জায়গাটি থেকে একটি নদী উপত্যকার অন্ত:দেশ বরাবর প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে চলে গিয়েছে। এটি আক্সারায় অঞ্চলের কাছে হলেও এটিকে কাপ্পাডোসিয়ার দক্ষিণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। লম্বা গমন পথ অনুসরণ করে হাঁটার জন্য এটি একটি শান্তিময় জায়গা। বৃক্ষপত্র চারদিক আচ্ছাদিত পথ অনুসরণ করতে করতে আপনি দেখতে পাবেন ঐতিহাসিক গুহার ভেতরকার গির্জাগুলো। ১০৫টি গির্জার মধ্যে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ১৬টি। বহু বছরের পুরনো চিত্রকর্ম ও খোদিত মূর্তি গির্জায় রয়েছে। গাছের ছায়ায় হাঁটতে-হাঁটতে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে আপনি ভুলেই যাবেন যে আপনি কোনো শুষ্ক এলাকায় ভ্রমণ করতে এসেছিলেন। পথে যেতে যেতে দেয়ালের বিভিন্ন রঙিন ফুলের চিত্রকর্ম আপনাকে বারংবার টেনে ধরবে। এখানে একটি ঝরনা ধারা রয়েছে যেখানে পর্যটকরা সাঁতার কাটে। আপনি যদি পশুর মতো আকৃতির পাথর দেখতে চান তাহলে অবশ্যই আসতে হবে ডেভরেন্ট ভ্যালিতে। অনন্য এই প্রাকৃতিক কাঠামোগুলো ভ্রমণের আকর্ষণ মাত্রা বাড়িয়ে দিবে। দীর্ঘ শ্রান্ত পথ পার করে বহু পর্যটক আসেন এই উপত্যকায়।

অবাক করা মেসকিনদির ভ্যালি। ছবি : ড্রিমস টাইম ডট কম

 দিনের মধ্যভাগে যদি স্বল্প সময়ের জন্য ঘুরতে যেতে চান তাহলে মেসকিনদির ভ্যালিতে বেড়াতে যেতে পারেন। এখানে রয়েছে অসংখ্য মনমুগ্ধকর সুরঙ্গপথ। এটি অনেকটা ছায়াময় জায়গা এবং লাভ ভ্যালির সাথে বেশ মিল রয়েছে এর। সুড়ঙ্গের মধ্যকার চিত্রকর্ম দেখে মনে হবে আপনি যেন এক অনন্য বিশালতায় ডুবে আছেন।

অদ্ভুত গড়নের জমজ রূপকথার চিমনি। ছবি : ড্রিমস টাইম ডট কম

কাপ্পাডোসিয়ার বিখ্যাত চিমনির বাইরে আরেক ধরনের চিমনির পরিচয় রয়েছে যাকে বলা হয় জমজ রূপকথার চিমনি। এই অদ্বিতীয় সৃষ্টি পর্যটকদের মাঝে বিস্ময়ের কমতি রাখেনা। এটি দেখে কখনই মনে হবে না যে লক্ষাধিক বছর ধরে নিজস্ব প্রাকৃতিক গঠনে সৃষ্ট। মনে হবে যেন কোন এলিয়েন এসে এগুলো তৈরি করেছে। কাপ্পাডোসিয়ার থেকে প্রায় এক ঘন্টা দূরে অবস্থিত তুজ হ্রদ। এটি কোন সাধারণ হ্রদ নয়। কেননা এই হ্রদের সম্পূর্ণ পানি গোলাপি রঙের। এই পানি দেখে মনে হবে যেন কেউ নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে জল রং দিয়ে সব এঁকেছে।

গোলাপি রঙের পানি, তুজ হ্রদ।  ছবি : রেড্ডিট

বাংলাদেশ থেকে কাপ্পাডোসিয়ায় যেতে হলে কাতার এয়ারলাইন্সে ২৫,০০০ টাকা থেকে ৬৮,০০০ টাকার মধ্যে আপনি যেতে পারেন। এক্ষেত্রে সময় লাগবে প্রায় ২০ ঘন্টা ৩০ মিনিট। কাপ্পাডোসিয়ায় পৌঁছনোর পর আপনি একজন ব্যক্তিগত গাড়িচালক ভাড়া করতে পারেন কয়েক ঘণ্টার জন্য। তিনি আপনাকে বিভিন্ন জায়গায় নিরাপদ ভ্রমণে সাহায্য করবেন। সেক্ষেত্রে আপনার খরচ পরবে প্রায় ৯৮০ টাকা।

উচাইজারসহ কয়েকটি উপত্যকায় ঘুরার জন্য স্কুটার ভাড়া করতে পারেন। সেক্ষেত্রে খরচ পড়বে প্রায় ২,০০০ টাকা। এখানে আশপাশে অসংখ্য হোটেল রয়েছে আপনার সুবিধামতো সেবা প্রদানের জন্য। আপনি এমন হোটেলেও থাকতে পারেন যেখান থেকে ছাদে উঠে অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। হোটেল খরচ প্রতি রাতের জন্য ৪,৫০০ টাকা থেকে ১৪,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কাপ্পাডোসিয়া এক বিস্ময় ভরা অঞ্চল। তবে এখানে কিছু বিষয় লক্ষণীয় রয়েছে।

অনেক সময় পর্যটকরা বুঝতে চায় না সব সময় বাতাসের উদীয়মান বেলুনগুলো ভ্রমণ করা সম্ভব না। অনেক সময় ভারী বাতাস বহমান থাকলে বেলুন উড়ানো যায় না। কেননা বেলুনে কোন ব্রেক নেই এবং তখন যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক সময় এক বা দুই দিনের জন্য ঘুরতে গেলেই যে বেলুনে উঠা যাবে এমনটি নয়। আবহাওয়া এক্ষেত্রে কতটা অনুকূলে থাকে সেটি বড় বিষয়। তাই ভালোভাবে ভ্রমণ করার জন্য পাঁচ থেকে সাত দিন সময় হাতে নিয়ে যাওয়াই উত্তম।