নীল মসজিদ/ব্লু মস্ক ইস্তানবুল, তুরস্ক। ছবি : সংগৃহীত
তুরস্কের অন্যতম প্রধান শহর ইস্তানবুল। পৃথিবীর বৃহত্তম শহরের মাঝে এটি একটি। আপনি যদি কখনও প্রশ্নের সম্মুখীন হন যে, এশিয়া এবং ইউরোপের প্রবেশদ্বার শহর কোনটি , আপনার উত্তর হবে-ইস্তানবুল!
অটোমান এবং বাজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে যেমন শহরটি ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনই বর্তমানে এটি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম বিখ্যাত জায়গা।
ধর্মীয় স্থাপনা কিংবা বৈচিত্র্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার জন্য ইস্তানবুল পর্যটকদের তালিকার শীর্ষে থাকে সবসময়।
ইস্তানবুল শহরে অবস্থিত নীল মসজিদ অথবা ব্লু মস্ক (Blue Mosque) সুন্দরতম স্থাপনার এক অনন্য নিদর্শন। নীল মসজিদ অথবা ব্লু মস্ক এর প্রকৃত নাম 'সুলতান আহমেদ মসজিদ' (Sultan Ahmed Mosque)।
মসজিদের অভ্যন্তরে হাতে আঁকা টাইলসের নীল কারুকার্যের জন্য এটি নীল মসজিদ নামেই বেশি পরিচিত। প্রায় ২০ হাজার আকর্ষণীয় নীল টাইলস বসানো হয়েছে এখানে।
দিনে শত শত রঙ্গিন জানালা এবং রাতে তেরটি গম্বুজ এবং ছয়টি মিনার থেকে নীল আলো বিচ্ছুরিত হয়ে এক অপার্থিব পরিবেশের অবতারণা করে। নীল আভায় পরিপূর্ণ অসম্ভব সুন্দর এই মসজিদ তুরস্কের অন্যতম এক ঐতিহাসিক নিদর্শন।
নীল মসজিদ/ ব্লু মস্ক ইস্তানবুল, তুরস্ক। ছবি : উইকিপিডিয়া
ইতিহাস
এটির স্থাপনার সময়সীমা ১৬০৬ সাল থেকে ১৬০৯ সাল পর্যন্ত। অটোমান সাম্রাজ্যের নিদর্শন হিসেবে সুলতান আহমেদ এটি নির্মাণ করেন। তিনি চেয়েছিলেন অন্তত ৪০ বছর যেন এর জৌলুস আভিজাত্য বজায় থাকে। তিনি কখনোই হয়তো ভাবেননি যে নির্মাণের ৪০০ বছর পরেও এটি সমান জৌলুসে ভাস্বর হয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ প্রতিবছর স্থাপনাটি দেখতে ভীর জমান।
অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপনা হাজিয়া সোফিয়ার সামনেই অবস্থিত এই নীল মসজিদটি। মসজিদটির এক অংশে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় ১০ হাজার মানুষ একত্রে নামাজ পড়তে পারেন এখানে।
ইতিহাস অনুযায়ী, মেহমেত আগা মসজিদটির কারিগর ছিলেন। তৎকালীন বিখ্যাত স্থপতিদের একজন ছিলেন তিনি। মসজিদটির নির্মাণে বেশ কিছু মজার বিষয় রয়েছে।
সুলতান আহমেদের বয়স যখন ১৯ তখন স্থপতিদের বলেন, মিনারটি যেন স্বর্ণের বানানো হয়। স্থপতিরা কথাটি বুঝতে না পেরে ছয়টি মিনার তৈরি করেন!
মসজিদের কারুকাজ
চারটি মিনার মসজিদের চার কোনায় এবং বাকী ২ টি পেছনে অবস্থিত। মসজিদের মিনার এবং গম্বুজগুলি নীল-সাদা সীসা দিয়ে আবৃত এবং উপরের অংশ সোনার প্রলেপযুক্ত তামা দিয়ে আচ্ছাদিত। মিনার গুলি পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
নীল মসজিদ/ব্লু মস্ক ইস্তানবুল, তুরস্ক। ছবি : ট্যুরিস্টস পোট্রেইটস
নীল মসজিদের অভ্যন্তরে সাজ-সজ্জা এবং আলোকসজ্জা অনেক সুন্দর। মনে করা হয়ে থাকে যে এর ঝাড়বাতিটিকে তৎকালীন সময়ে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করা হতো।
মসজিদের ছাদ এবং দেয়াল জুড়ে কারুকাজ, নকশা এবং কোরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি করা আছে। এছাড়াও পঞ্চাশটি টিউলিপ ডিজাইন এর সৌন্দর্য অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রাচীন নিকিয়া রীতির কারুকার্য এবং হাতে নির্মিত ইজমিক টাইলস এর আকর্ষণ বাড়িয়েছে বহুলাংশেই। মসজিদটির মেঝেতে দামি কার্পেট বিছানো। নিয়মিত সেগুলি পরিবর্তন করা হয়ে থাকে।
মসজিদ চত্বরে ব্যবহৃত মূল্যবান পাথর গুলি একটি দ্বীপ থেকে আনা হয়েছিলো সে সময়ে। মসজিদটির গম্বুজে ১৪টি জানালা এবং কেন্দ্রীয় গম্বুজে ২৮টি জানালা রয়েছে। ভেনিসের সিগনোরিয়া সুলতানকে জানালার রঙ্গিন কাঁচগুলি উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।
মসজিদের গম্বুজ এবং মিনার গুলো রাতের বেলায় বাতির আলোয় এক অসম্ভব রকমের সুন্দর দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। অনেক পর্যটক এটি দেখার জন্য দীর্ঘ সময় রাতে অপেক্ষা করেন।
মুসলিম বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদে রয়েছে একটি মাদ্রাসা, মাজার, এতিমখানা এবং হলরুম। তুরস্কের সর্বাধিক জনপ্রিয় স্থান এটি। সবসময় লোকে লোকারণ্য থাকে এই মসজিদটিতে। তুরস্ক ভ্রমণে এই মসজিদ অবশ্যই আপনার ভ্রমণ তালিকার শীর্ষস্থান দাবিদার।