থর মরুভূমি : বিচিত্র সৌন্দর্য মাখা ভারতের মরুভূমি
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সোনালি বালিয়াড়ির সৌন্দর্য ও রঙিন রাজস্থানের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি দেখতে থর মরুভূমি

অবস্থান
ভারতের রাজস্থানের জয়সালমিরের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে এই মরুভূমি অবস্থিত। 'থর' শব্দটি এসেছে 'থল' থেকে যার অর্থ হল বালির পাহাড়। এই মরুভূমির বেশির ভাগ অংশ পড়েছে রাজস্থানে। আর বাকিটা পড়েছে হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্যের দক্ষিণ ভাগে, গুজরাট রাজ্যের উত্তরভাগে, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের পূর্ব অংশে এবং পাঞ্জাব প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। এই মরুভূমির উত্তরে শতদ্রু নদী, পূর্বে আরাবল্লী পর্বতমালা, দক্ষিণে কচ্ছ জলভূমি এবং পশ্চিমে সিন্ধু নদী। প্রায় আড়াই লক্ষ বর্গ মাইল জুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমির মধ্যে জনবসতির দেখা পাওয়া যায়। দ্রাবিড়-সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পারা এখানে বাস করে। এই মরুভূমিতে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে এই মরুভূমিতে প্রচুর বালির বিস্তার দেখা গেলেও এখানে বালির সঙ্গে আছে লালচে ও বাদামি মাটি। অনেক জায়গায় বালি ও মাটি বেশ লবণাক্ত। যার ফলে বেশ কয়েকটি লবণ হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে এখানে। মরুভূমির মাঝে এই হ্রদ গুলো দেখতে খুব দৃষ্টিনন্দন।আরও পড়ুন : রাজস্থানের বিখ্যাত পাঁচ খাবার

কি কি দেখতে পাবেন
মরীচিকার কথাতো আমরা কম-বেশি সবাই শুনেছি। এই মরুভূমির পথে হাঁটতে হাঁটতে হয়ত দেখা পেতে পারেন মরীচিকার। এই মরীচিকাকে পানি ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না যেন। এখানে আছে বুনো উট। মরুভূমির বুকের এই উটকে সবাই মরুভূমির জাহাজ নামেই বেশি চিনে। এই উটের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো একটা বিশেষ অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। এই মরুভূমির চমৎকার ব্যাপার হল এখানে প্রতি বছর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টির ছোঁয়া লাগা মাত্রই নানা রকম গাছপালা আত্মপ্রকাশ করে এখানে। বৃষ্টি হওয়ার পর বালির উপরে সবুজ ঘাসের আবরণ পড়ে। বালিয়াড়ির মধ্যে দেখা যায় খেজুর ও 'জাল' গাছ। এখানকার 'ফগ' এর ঝোপ উটের প্রিয় খাবার। যাযাবররা এই গাছের শুকনো পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে।আরও পড়ুন : দুবাই ডেজার্ট সাফারি : মরুভূমির বুকে বিস্ময়কর ভ্রমণ

লানা
লোনা বালিতে তিন ফুট উঁচু ছোট গাছ দেখা যায়। নাম তার 'লানা'। মরুভূমির সমতল অঞ্চলে কের, কুল, আঁকরা, ঝুঝনি নামের নানা রকমের গুল্ম চোখে পড়ে। হেমন্ত থেকে শুরু করে শীতের শেষ পর্যন্ত এই গুল্ম ভরে থাকে কমলা, বেগুনি, হলুদ ও সাদা ফুলে। কিছু বড় আকারের গাছও এই মরুভূমিতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে আছে বাবলা, ধও, পলাশ, সেগুন, গুগগুল ইত্যাদি।মরুভুমির পশুপাখি
শুধু গাছপালাই নয়, এখানে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীও দেখা যায়। অন্ধকার নামলেই বেরিয়ে আসে নানা ধরনের গিরগিটি আর গোসাপ পুরো মরুভূমি জুড়ে চরে বেড়ায় কৃষ্ণসার হরিণ। আরও আছে বুনো শুকুর, মরু-ইঁদুর,ব্যাঙ,নীল গাই। এই মরুভূমিতে আছে সিংহ আর বুনো গাধা। সিংহ গুলো থাকে গুজরাটের 'গির' বনে। এই বন আসলে থর মরুভূমিরই পশ্চিম অংশের ঘাসে ঢাকা অংশ। এছাড়া, এই মরুভূমিতে নানার কমের পাখি ও দেখতে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে আছে ফ্লেমিঙ্গো পাখির দল, বুলবুল, ঘুঘু, পায়রা, দোয়েল, চিল, বালি-মোরগ, বাস্টার্ড আর ময়ূর। বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের এই মরুভূমি বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকর্ষণ করে। প্রতি বছর দুইলক্ষের মত পর্যটক ঘুরতে আসে এই মরুভূমিতে। এই মরুভূমির বুকে সানসেট পয়েন্টে সূর্য ডোবার অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ে। এখানে পর্যটকেরা এই দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় করেন। তপ্ত সূর্যটা দিনশেষে বালুর বুকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। পশ্চিম আকাশে মস্ত বড় সূর্যটা বালুর বুকে ডুবে গিয়ে আকাশে ছড়িয়ে দেয় গোধূলির রক্তিম আভা। মরুভূমির বুকে রাতটা নামে একটু তাড়াতাড়ি। সারি সারি কাফেলা আর চাঁদের আলোয় মরু প্রান্তর যেনও আরেক মোহনীয় জগত। রাতের মরুভূমিতে তাবুতে বসে আপনার অনুভূতিগুলো অন্য মাত্রা ছুঁয়ে যাবে।
যেভাবে যাবেন :
কলকাতা থেকে ট্রেনে জয়সালমির যেতে পারেন। যেতে সময় লাগবে কমবেশি ৩৮ থেকে ৪০ ঘণ্টা। এছাড়া দিল্লি হয়েও যাওয়া যায়। এতে বিরতি নিয়ে যেতে পারবেন। জয়সালমিরের প্রতিটি হোটেলেই ডেজার্ট সাফারির প্যাকেজ রয়েছে। এক্ষেত্রে দু-ধরনের প্যাকেজ পাবেন। রাতে থাকতে চাইলে একরকম খরচ আর রাতে না থাকলে অন্য রকম খরচ। এছাড়া উটের পিঠে চড়ার জন্য আলাদা খরচ পড়বে।রুবাইদা আক্তার এস এম