নামিব মরুভূমি : সমুদ্র ও মরুভূমি যেখানে একসাথে মিশেছে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পৃথিবীর বুকে মঙ্গলগ্রহ - প্রতিকূল আবহাওয়া ও শুষ্কতার জন্য ‘নরকের দুয়ার’ হিসেবে পরিচিত



নামিব মরুভূমি Namib Desert

পৃথিবীর সবচেয়ে রুক্ষ জায়গাগুলোর মধ্যে একটি নামিব মরুভূমি, দক্ষিণ আফ্রিকা। ছবি : ব্রিটানিকা


 ভ্রমণে অ্যাডভেঞ্চার যাদের পছন্দ তারা সুযোগ পেলেই বেড়াতে চলে যান অ্যাডভেঞ্চারাস কোনও জায়গায়। কারও নেশা পাহাড় জয় আবার কারও কারও নেশা সমুদ্রকে জয় করার। পৃথিবীজুড়ে অ্যাডভেঞ্চারাস জায়গার অভাব নেই। তবে কিছু কিছু জায়গা আছে যেগুলো যেমন ভয়ানক সুন্দর তেমনই রহস্যময় ও বিপজ্জনক। অ্যাডভেঞ্চা আর সুন্দরের মাঝে আছে বিপদ। এই জায়গাগুলোকে ঘিরে থাকা রহস্য আর রোমাঞ্চ সাহসী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তেমনই এক অবাক করা জায়গার কথা আজ জানাবো। এই জায়গাটি হলো নামিব মরুভূমি (Namib Desert)।


অবস্থান

আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের আটলান্টিক উপকূলে নামিব মরুভূমি অবস্থিত। আটলান্টিক মহাসাগরের কোলে অবস্থিত এই মরুভূমিটি নামিবিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও দক্ষিণ আফ্রিকার অংশজুড়ে বিস্তৃত। পৃথিবীর সবচেয়ে রুক্ষ জায়গাগুলোর মধ্যে এই মরুভূমি একটি।


সমুদ্র ও মরুভূমির মিলন

পৃথিবীর শুধুমাত্র এই জায়গাটিতে সমুদ্র ও মরুভূমি একসাথে মিশেছে। এ যেনও জলের সাথে রুক্ষতার মিতালি। এই মরুভূমিটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মরুভূমি যার বয়স প্রায় সাড়ে ৫ কোটি বছর। ৮১ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই মরুভূমিটি ২০০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২ হাজার কিলোমিটার লম্বা।

আরও পড়ুন : ডানাকিল মরুভূমি : পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম জায়গা



নামিব মরুভূমি Namib Desert

পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে সমুদ্র এবং মরুভূমি পাশাপাশি অবস্থিত; নামিব মরুভূমি, দক্ষিণ আফ্রিকা। ছবি : রেডিট


 স্থানীয় ভাষায় ‘নামিব’ অর্থ হল একটি জায়গা যেখানে কিছুই নেই। এই জায়গাটি তার প্রচণ্ড প্রতিকূল আবহাওয়া ও শুষ্কতার জন্য অনেকেরই কাছে ‘নরকের দুয়ার’ হিসেবে পরিচিত। দিনের বেলা এখানে তাপমাত্রা প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে আবার রাতে তা নেমে হয় শূন্যের নিচে। তাপমাত্রার এই ব্যাপক ওঠানামা এই মরুভূমিটিকে করে তুলেছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল জায়গা। বিস্তীর্ণ লাল বালু রাশির এই মরুভূমিতে পানির কোনও চিহ্নই নেই। উঁচু বালির পাহাড়, রুক্ষ পর্বত এবং নুড়ি পাথর ছড়ানো এই মরুভূমিটি দেখলে মনে হয় মঙ্গল গ্রহ। এই নুড়িপাথর, মৃত্তিকা ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহাড়ের শুষ্ক বৃক্ষগুলো এই মরুভূমিকে একটা আলাদা রূপ দিয়েছে। এখানকার লাল বালিয়াড়িগুলি ৩০০ মিটার উঁচু এবং ২০ মাইল দীর্ঘ। উঁচু এই বালিয়াড়িগুলো দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। এই মরুভূমিতে বছরে মাত্র ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। আবার এর কিছু অংশে একদমই বৃষ্টি হয় না। প্রচণ্ড শুষ্ক ও বিরূপ আবহাওয়ায় কোনও প্রাণী টিকে থাকার কথা না।

মরুভূমির জীবজন্তু

কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হল এই বৈরী আবহাওয়াতেও এখানে অনেক প্রাণী টিকে আছে। আফ্রিকান বুশ এলিফ্যান্টস, মাউন্টেন জেব্রা, স্প্রিংবক, চিতা, হায়েনা এবং অন্যান্য বড় স্তন্যপায়ীদের দেখা যায় এখানে।

আরও পড়ুন : প্রাইড অব আফ্রিকা বা ব্লু ট্রেন: বিশ্বের সবচেয়ে সেরা ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা!



নামিব মরুভূমি Namib Desert

বৈরী আবহাওয়া স্বত্বেও নামিব মরুভূমিতে আফ্রিকান বুশ এলিফ্যান্টস, মাউন্টেন জেব্রা, স্প্রিংবক, চিতা, হায়েনা সহ নানা প্রাণীর দেখা মেলে। ছবি : শাটারস্টক


আরও আছে উট পাখি, অরিক্স জাতীয় হরিণ, নামাকোয়া গিরগিটি, লম্বা ঠ্যাংওয়ালা পিঁপড়া, নামিব স্যান্ড গেকো বা বালিয়াড়ির টিকটিকি, বালিয়াড়ির কাঁকড়া বিছে ইত্যাদি। এই প্রাণীগুলো এখানকার প্রচণ্ড বিরূপ ও রুক্ষ পরিবেশের সাথে নিজেকে অভিযোজিত করে নিয়েছে। সূর্যের তাপে মহাসাগরের পানি বাষ্পীভূত হয়ে এই মরুভূমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। নিয়মিত কুয়াশা পড়ে এখানে। এই কুয়াশার কারণে সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর পরিবেশ তৈরি হয় আটলান্টিকের উপকূলে ৫০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উঁচু বালির পাহাড়ে। এই উপকূল প্রায়ই ঢাকা পড়ে ঘন কুয়াশায়। যার ফলে অসংখ্য জাহাজ পথ হারিয়ে উপকূলে আছড়ে পড়ে। যা জাহাজের যাত্রীদের মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে।


ফেইরি সার্কেল

এই নামিব মরুভূমির আরেকটি বিস্ময়কর জিনিস হলো ফেইরি সার্কেল বা ফেইরি রিংস। বৃষ্টি হলেই অনেকটা জাদুর মত এই বৃত্তগুলো দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে ঘাসে আবৃত কতগুলো গোল আকৃতি যার ভেতরটা পুরোপুরি খালি। ঘাসের একটি প্রজাতি বালির ওপরে এই বৃত্ত তৈরি করে। এই বৃত্তগুলো সমতল ভূমি এবং উঁচু বালির পাহাড় দুই জায়গাতেই দেখা যায়। এই বৃত্তগুলো এখানে কেন তৈরি হয় তার বিশদ কোনও ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা আজও পাননি। এই বৃত্তগুলোর জন্য এই মরুভূমিটিকে আরও বেশি অন্য কোনও গ্রহ বলে মনে হয়।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম