বিশ্বব্যাপী যেভাবে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মাতৃভাষা বাংলার জন্যে আসামেও প্রাণ দিয়েছিল অনেকে

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা। ছবি : সংগৃহীত[

সমগ্র বিশ্বজুড়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত থাকলেও ২০১৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মত নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয়ে মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয়। তবে, এর আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যথাযথ মর্যাদায় নানা আয়োজনে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বাঙালিরা বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ববোধ থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করলেও অন্যান্য দেশীয় জনগোষ্ঠীরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। সকলেই নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে এই দিনটিতে। ভারত : আমরা জানি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কোলকাতা ইত্যাদি জায়গায়ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বসবাস রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে ভারতের আসামে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার্থে ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাক উপত্যকায় তৎকালীন বাঙালীদের আন্দোলনে নামতে হয়েছিল। ১৯৬০ সালে ১০ অক্টোবর আসামে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে বরাক উপত্যকায় বাঙালিরা প্রতিবাদ শুরু করে। ১৯৬১ সালের ১৯মে আসাম সরকারের পুলিশের গুলিতে সত্যগ্রহীদের মধ্যে ১০জনের বেশি শহীদ হন। এর মধ্য দিয়ে বাংলা আসামের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আসামের শিলচরের গান্ধিবাগে এই শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনারও স্থাপিত হয়। বর্তমানে ১৯মে আসামের বাংলা ভাষাভাষীরা সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এখানে পুস্পস্তবক অর্পণ করে। তবে ২১শে ফেব্রুয়ারিতেও এখানে অনেকে ফুল দিতে আসেন।

Silchar_Language_Marters শিলচরের এই রেলওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'ভাষা শহিদ স্টেশন'। ছবি : উইকিওয়ান্ড

এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া এবং চন্দননগরে আরো দুটি শহীদ মিনার রয়েছে যেখানে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পিত হয়।

পাকিস্তান :

পাকিস্তানের পাঠ্যবইয়ে মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে বিস্তারিত না লেখা থাকলেও ২১শে ফেব্রুয়ারি কাগজে কলমে বেশ ঘটা করেই এখানে উদযাপিত হয়। দেশটির করাচি, ইসলামাবাদ এবং লাহোরের মত বড় শহরগুলোতে বিভিন্ন সেমিনার এবং নানা আয়োজনের সমারোহে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রভারতফেরীরও দেখা পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারির ১৮ এবং ১৯ তারিখে দুই দিনব্যাপী সাহিত্য উৎসবও হয়েছিল। পাকিস্তানের রাষ্ট্রা ভাষা উর্দু হলেও এখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী মিলে প্রায় ১৭টি প্রচলিত এবং স্বল্প প্রচলিত ভাষা রয়েছে মূলত এই ভাষাগুলোর প্রতি সচেতনতা স্বরূপ এখানে মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা হয়।

লন্ডন :

২১শে ফেব্রুয়ারির মূল আকর্ষণ পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের শহীদ মিনার। প্রবাসীসহ বাংলাদেশীসহ বহু দেশের মানুষের স্বীয় মাতৃভাষার কথা স্মরণ করে এখানে সমাবেত হন। রাত ১২টা থেকেই শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার উদ্দেশ্যে এখানে আসতে শুরু করেন হাজার হাজার জনতা। এছাড়া পূর্ব লন্ডনের কবি নজরুল সেন্টারে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক আয়োজনও দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র :

shahid minar new york নিউইয়র্কের জাতিসংঘ কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী শহীদ মিনারে ভাষাপ্রেমীরা ফুল দিতে জড়ো হন। ছবি : কালেরকন্ঠ

২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডাকবিভাগ প্রথম স্মারক সিলমোহর প্রকাশ করে। এছাড়া বহু জাতিগোষ্ঠীর সমারোহে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ও বাঙালীর চেতনা মঞ্চের উদ্যোগে জাতসংঘ কার্যালয়ের সামনে বানানো হয় অস্থায়ী শহীদ মিনার। বাংলাদেশের সাথে ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরের মিল রেখে ২০ফেব্রুয়ারি দুপুরে এই শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণ করা হয়। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন ১৯৯২ সাল থেকে প্রবাসীদের নিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালনের আয়োজন করে আসছে। এর বাইরে জ্যাকসন হাইটসে ২৩ এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি বইমেলারও আয়োজন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে অবস্থিত স্থায়ী শহীদ মিনারে সেখানকার অধিবাসীরা ফুল এবং স্তবক প্রদান করেন। বিভিন্ন এ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন থাকে এখানে।

সুইডেন :

দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে এই দিনটির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। এছাড়াও জাতীয় সংগীত গাওয়া এবং আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়ে থাকে দূতাবাসের পক্ষ থেকে। এই অনুষ্ঠানে ভাষাশহীদদের স্মরণ করতে হাজির হন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের জনগন।

স্পেন :

স্পেনের বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে সাধারণত ২১শে ফেব্রুয়ারির আয়োজন করা থাকে। এছাড়াও স্পেনে বসবাসরত প্রবাসীদের সংগঠন বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন ইন স্পেনের উদ্যোগে বাংলাদেশী অধ্যূষিত লাভাপিয়েস চত্বরে অস্থায়ী শহীদ মিনারও বানানো হয়। এখানেও স্বদেশ থেকে বহু দূরে ভাষার টানে বাঙালীরা আসেন ফুল ও স্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনে। এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেখানে বাংলা ভাষাভাষীরা ছড়িয়ে আছে দেশীয় এ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে পালন করে থাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন দেশীয় জনগন স্বীয় মাতৃভাষা রক্ষার্থে কাজ করে যাচ্ছে এই দিনটিকে ঘিরে।   


তথ্যসূত্র : https://www.ppbd.news/expatriate/93377 https://www.prothomalo.com/life/durporobash https://www.breakingnews.com.bd/probash/article/56084 https://www.anandabazar.com/editorial/international-mother-language-day-2020-manbhum-witnessed-battle-for-language-1.1112939