সুইসাইড ফরেস্ট : নয়নাভিরাম বনটি আজ জাপানিদের আত্মহুতির প্রিয় স্থান
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ঘন সবুজ বনটির সারি সারি গাছ, কোনোটিতে ঝুলছে দড়ি
আত্মহত্যার জন্য বেছে নেয়া জাপানের সুইসাইড ফরেস্ট। ছবি : মেন্টাল ফ্লস্
জাপানের মাউন্ট ফুজির কাছে একটি বিশাল বন রয়েছে। আত্মহত্যার জন্য জাপানের অনেকেই বেছে নেন এই বন। তাই বনটিকে বলা হয় সুইসাইড ফরেস্ট। আনুমানিক ৮৬৪ সালে মাউন্ট ফুজিয়ামা থেকে যে আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়, সেই আগ্নেয়গিরির লাভা জমে সৃষ্টি হয় এই বনের। জাপানি ভাষায় বনটিকে বলা হয় জুকাই। বনটিকে দেখে মনে হয় যেন গাছের গভীর সমুদ্র। ঘন ঘন গাছগাছালিতে ঘেরা এই বন দেখতে অনেকটা ভুতুড়ে প্রকৃতির। বনের ভেতরের পথগুলো শিকরেরে বেড়াজালে বন্দি। উঁচু-নিচু, আঁকা-বাঁকা শিকর এবং পিচ্ছিল পাথরে ভরপুর এই বন। ফুজিয়ামা পাহাড় থেকে বনটিকে পুরো সবুজ দেখায়। সেখান থেকে বনটিকে দেখে মনে হয় যেন একটি সবুজ সমুদ্র। বনের ভেতরে গাছের সাথে বাঁধা লম্বা লম্বা দড়ি দেখতে পাওয়া যায়। বনের ভেতরে যারা প্রবেশ করেন তারা গাছের সাথে দড়ি বাঁধতে বাঁধতে এগিয়ে যায়। ফিরে আসতে চাইলে, সেই দড়ির মাধ্যমে ফেরার পথ খুঁজে বের করে। অথবা তাঁদের কেউ উদ্ধারের জন্য এলে সেই দড়ির সাহায্যে তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারে। গাছের সাথে তাদের লাগানো ট্যাপ বা দড়ি ধরে ধরে শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে গেলে আসল ঘটনা জানতে পারে উদ্ধারকর্মীরা। কখনও খুঁজে পায় মরদেহ। আবার কখনও পায় কি কাপড় জড়ানো কঙ্কাল।
ছবি : লেন্স দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস্
এছাড়াও পাওয়া যায় তাদের ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন চিহ্ন। কিছু না কিছু পাওয়া যায়ই। অনেক সময় আবার সুইসাইড নোট ও পাওয়া যায়। পাওয়া যায় তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও।
বহু বছর আগে আত্মহত্যাকে ধরা হত সামুরাই এর চলন। সে কালের দরিদ্র পরিবারের মানুষজন তাঁদের পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যদের খরচ বহন করতে পারত না বিধায় তাঁদের বনে রেখে আসতেন। বৃদ্ধ সদস্যরা সেখানে অনাহারে থেকে মারা যেতেন।বনের মধ্যে মোবাইলের কোনো সিগন্যাল পাওয়া যায় না।
এই বনে সুইসাইডের পরিমাণ এতো বেশি, যে বর্তমানে এই বনটি মানুষের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ১০০ টিরও বেশি লাশ পাওয়া যায় বনটিতে। সুইসাইডের পরিমাণ কমাতে পুলিশ বনের বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতামূলক পোস্টার লাগিয়েছে। যেন সুইসাইড করতে বনে আসা মানুষেরা একবার হলেও ভাবে।
সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকে, 'আপনার জীবন খুবই মূল্যবান। বনে ঢুকার আগে দয়া করে আপনার পরিবার, ভাই-বোন, সন্তানদের কথা চিন্তা করুন। তাদের কাছে আপনার জীবন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আরেকবার চিন্তা করুন। বন্ধুদের সাথে কথা বলুন। সুইসাইড প্রিভেনশান অ্যাসোসিয়েশান এর সাথে যোগাযোগ করুন। ফিরে যান।
পরিবারের কাছে, বন্ধুদের কাছে ফিরে যান।' অনেকে ফিরেও যায়। তবে ফিরে যাওয়ার হার তুলনামূলকভাবে একটু কম। ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, অনেকে গাছের সাথে দড়ি বেঁধে আত্মহত্যা করে, আবার অনেকে বেছে নেয় ঘুমের অসুধ। আবার অনেকে মারা যান না খেয়ে দুর্বল হয়ে। বনের আশে পাশের এলাকার ছোট ছেলেমেয়েদের এই বনে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা থাকে। একটি ভয়ানক জায়গা বলে ব্যাখ্যা করা হয় তাদের কাছে। তাই শিশুরা ভয়ে বনের কাছে যায় না। টুরিস্টদের জন্য বনের কিছু অংশ উন্মুক্ত করা আছে। তারা ঘুরে ঘুরে বনটি দেখতে পারবে। তবে বনের কিছু এলাকায় না যাওয়ার জন্য রয়েছে কঠিন নিষেধাজ্ঞা। এতো বড় বনে হারিয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। তাই সেই জায়গাগুলো সিল করে দেয়া হয়েছে। সেরকম কোন চিহ্ন দেখলে তা এড়িয়ে যাওয়াই ভাল।
ছবি : পিন্টারেস্ট
বর্তমানে মুঠো ভর্তি এই সমাজ বড়ই নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে। আমরা সরাসরি কথা বা যোগাযোগ না করে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছি। যার কারণে আমরা মাঝে মধ্যেই একা বোধ করি। সত্যি কথা বলতে কি, সামনা সামনি যোগাযোগ করাটা খুবই জরুরি। কেননা সরাসরি কথা বললে আমরা সামনের মানুষের চেহারা, চোখ, তার কথা বলার ভঙ্গি দেখে অনেক কিছু আঁচ করতে পারি। যা আমরা অনলাইনে চ্যাটের মাধ্যমে বুঝতে পারি না। অনেক সময় না বলা অনেক কথাও বুঝে ফেলা যায়। খুব অবাক করা কাণ্ড এইযে, যে মানুষ এতো সুন্দর একটি বনে কীভাবে নিজের প্রাণ নিয়ে নিতে পারে! অনেক সময়ই আমরা নিজেকে একা ভাবি। কিন্তু আসলে দিন শেষে আমরা কেউই একা নয়। আসুন পাশের মানুষটিকে নিজে বাঁচি। সকলে একসাথে বাঁচি।
তথ্যসূত্র : https://www.youtube.com/watch?v=5y9uiohoRuA https://www.youtube.com/watch?v=4FDSdg09df8&bpctr=1599587627 https://www.japantimes.co.jp/life/2011/06/26/general/inside-japans-suicide-forest/