হারিয়ে ফেলা সোনালী ঐতিহ্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : লোক সংস্কৃতির এসব ঐতিহ্য এখন আমাদের সোনালী স্মৃতি

বাঙালি বধূকে এভাবেই শ্বশুরালয়ে নিয়ে যাবার ঐতিহ্য ছিল এককালে বাঙালি বধূকে এভাবেই শ্বশুরালয়ে নিয়ে যাবার ঐতিহ্য ছিল এককালে। ছবি : প্রথম আলো

সময় বয়ে চলেছে তার নিজস্ব গতিতে।মানুষ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে  আধুনিক জীবনযাত্রাকে সঙ্গে নিয়ে। আধুনিক জীবনযাপনে দিনকে দিন লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি।তবে বাঙ্গালির রয়েছে এক গৌরবময় ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালি এই ঐতিহ্য গুলো ধারণ করে আসলেও সময়ের সাথে অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে কালের গহ্বরে। আজকে কিছু হারানো এবং কিছু বিলুপ্ত প্রায় ঐতিহ্যের শেকড় সম্পর্কে আপনাদের জানাতে চেষ্টা করবো :

পালকি :

আবহমানকাল ধরে চলে আসা বাঙ্গালি ঐতিহ্যের সাথে পালকির নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। পূর্বে মূলত মানুষ বহন করার জন্যই ব্যবহার করা হতো এই বিলাসবহুল বাহন। প্রাচীনকালে ধনী গোষ্ঠী এবং সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা এর মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতেন। পালকির ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কোনও সুস্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায় না।তবে জানা যায়, পারস্য রাজ্যে, মিসরীয় চিত্র কর্মে পালকির অস্তিত্ব ছিল। হিন্দুদের রামায়ণে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০ সালের  দিকে পালকির উল্লেখ পাওয়া যায়। বাঙ্গালির বিয়ের সাথে পালকির এক অসম্ভব সুন্দর  যোগসূত্র  ছিল। পূর্বে পুরুষরা বিয়ে করতে বউয়ের বাড়ি যাবার  সময় এবং বউ নিজের বাড়িতে নিয়ে আসার সময় পালকি বাহন হিসেবে ব্যবহার করতো। পালকির গায়ে আঁকা হতো রং বেরঙের নকশা। সৌন্দর্য  বর্ধনের জন্য কখনো কখনো ফুল দিয়ে সাজিয়ে তোলা হতো এই পালকিকে। রাস্তায় চলার পথে বেহারারা কখনো কখনো বাঁধতো গান বা ছন্দ। নকশী কাঁথা। ছবি : দর্পণ

 নকশীকাঁথা :

নকশীকাঁথা বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটি অংশ।নকশীকাঁথার কদর এখনও রয়েছে কিন্তু  আমাদের এই ঐতিহ্যটি আজ বিলুপ্তির পথে।পূর্বে নকশীকাঁথা ছিল গ্রাম বাংলার মা বউদের অবসরের সঙ্গী।তারা সময় পেলে জুড়তো রং বেরঙের নকশী কাঁথা।পরিবারে নতুন বাচ্চা আগমনে কিংবা মেয়েকে বিয়ে দেবার সময় উপঢৌকন হিসেবে শ্বশুর বাড়ি পাঠানো হতো এই কাঁথা। গোলা : পূর্বে গ্রাম বাংলায় কৃষকদের বাড়িতে ধানের গোলা নেই এমনটা যেন কেও কল্পনাও করতে পারতো না। কিন্তু  এখন মাঠের পর মাঠ জমি আছে। কিন্তু  ধানের গোলা বিলুপ্ত প্রায়। বাঁশ দিয়ে বিশালাকার গোলা আকৃতির তৈরি করে এঁটেল মাটির কাঁদা ভেতরে ও বাইরে প্রলেপ লাগিয়ে  তৈরি করা হতো এই গোলা। গেরস্থ বাড়িতে এই গোলাতে রাখা হতো  ফলানো শস্য সারা বছরের জন্য।বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসে বর পক্ষ কনে পক্ষ একে অপরের ধানের গোলার খবর নিতো। কিন্তু বর্তমানে এটি কেবল কল্পকাহিনী।

ছবি : সংগৃহীত

মাটির ঘর :

বাঙ্গালির ঐতিহ্যের এক অন্যতম নিদর্শন মাটির ঘর। অনেকে এই ঘরকে শান্তির নীড় বলেও অভিহিত করে থাকেন। ইট,পাথর আর কংক্রিটের বেড়াজালে আবদ্ধ হবার পূর্বে মানুষ মাটির ঘরেই বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো। যদিও বর্তমানে কিছু অঞ্চলে এই ঘর দেখতে পাওয়া যায় তবে পূর্বে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই থাকতো মাটির ঘর। পরিবেশ বান্ধব এই ঘরটি পল্লীগ্রামে খুব যত্নের সাথে তৈরি করা হতো। আবার কোনও কোনও  ঘরের দেয়ালে শোভা পেত রঙ-বেরঙের আলপনা। ঘরটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনই এই ঘরে শীত, গ্রীষ্ম কিংবা যেকোনো ঋতুতে থাকার মধ্যে রয়েছেও এক  অন্যরকম প্রশান্তি।

হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্য। ছবি : সংগৃহীত

 ঢেঁকি :

আগে ধান, গম বা অন্য যেকোনো শস্য গুড়ো করতে এই ঢেঁকি ব্যবহার করা হতো। গ্রাম বাংলার প্রত্যেকটি বাড়িতে শোভা পেত ঢেঁকি। শীতের শুরুতে  কিংবা নবান্নর আগে পিঠার চাল গুড়ো করার ধুম পরে যেত। বাড়ি বাড়ি ঢেঁকিতে ধান ভানাও যেন এক উৎসবে পরিণত হতো। গায়ের মহিলারা ধান ভানতে ভানতেই বাঁধতো ছন্দ, গাইতো গান।

ছবি : সংগৃহীত

বায়স্কোপ :

বায়স্কোপ যেন এক আশ্চর্যের বস্তু ছিলো।কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার দৃশ্য নগরজীবনে আর চোখেই পড়ে না। আগে রাস্তায় রাস্তায় বায়স্কোপ দেখতো ছেলে বুড়ো সবাই। মেলা যেন বায়স্কোপ ছাড়া কল্পনাও করা যেন না। প্রকৃতপক্ষে বায়স্কোপ ছিলো গ্রামবাংলার সিনেমা হল।

গরুর গাড়ি :

প্রাচীন কালে কৃষি প্রধান দেশে শস্য থেকে শুরু করে সবজি বা যেকোনো দ্রব্য বহনে ব্যবহার করা হতো গরুর গাড়ি।মানুষের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে  যেতে গরুর গাড়িই ছিলো একমাত্র   বাহন।কালের বিবর্তনে এই বাহন আজ বিলুপ্ত প্রায়।

ছবি : প্রথম আলো

ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিতে সেরা বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বলে হয়তো শেষ করা যাবে না।খড়ম,পালকের কলম,ঘোড়ার গাড়ি,হুক্কা,শিকা, পিড়ি,ঘানি, খেজুর পাতার পাটি,আলতা, ইঁদারা, নাগরদোলা, সার্কাস, টেরাকোটা প্রত্যেকটি যেন আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। প্রত্যেকটি যেন আমাদের বাঙ্গালিত্ব বর্ণনা করে, ধারণ করে। তবুও সময়ের হাতছানিতে হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঐতিহ্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এসব হয়তো রূপকথার গল্প আর স্বপ্ন মনে হবে।বিজ্ঞানের এই যুগে নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার আমাদের বর্তমান জীবনধারাকে সহজ ও সুন্দর করে দিলেও এসব ঐতিহ্য যেন বাঙ্গালির রক্তে মিশে আছে।

  


তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো, যুগান্তর, নয়া দিগন্ত।