সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ফুট উচ্চতায় কার্শিয়াং পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা অপরূপ সিটং গ্রাম; ছবি : ট্রিপোটো ডট কম
মেঘ গায়ে মেখে নির্জন দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামে পা রাখতেই স্বাগত জানায় গাছে ঝুলে থাকা থোকা থোকা কমলালেবু। আশেপাশে শুধু কমলালেবুর সৌন্দর্য আর ঘ্রাণ।
গ্রামের আরও ভেতরে ঢুকলেই চোখের সামনে চলে আসে দিগন্তজোড়া সবুজে ঢাকা পাহাড়ের সারি। এখানে নেই কোনও ব্যস্ততা, নেই কোনও কোলাহল। গাড়ির কালো ধোঁয়া উড়িয়ে পর্যটকদের খুব একটা দেখা মিলে না এখানে।
নির্জনতা আর নৈসর্গ এখানে হাতে হাত মিলিয়ে চলে। গ্রামটির নাম সিটং (Sittong)। পাহাড়ি প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চলে যেতে পারেন দার্জিলিং এর কমলালেবুর গ্রাম সিটংয়ে।
দার্জিলিং জেলার সিটং গ্রাম কার্শিয়াং পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ফুট উচ্চতায় এটি অবস্থিত।
এই ছবির মতো সাজানো গ্রামটিতে পাহাড়ি প্রকৃতি অনেক বেশি নির্মল। পড়ন্ত বিকেলে নিস্তব্ধতার মাঝে এখানে শান্ত বাতাসের গুনগুনানি শোনা যায়।
মেঘের চাদর গায়ে মেখে নীরব আলস্যে গ্রামটি দাঁড়িয়ে আছে। এই গ্রামের বিশেষ পরিচিতি হল তার কমলালেবুর জন্য। যে দিকে চোখ যায় শুধু কমলার বাগান।
বাগানে বাগানে ঝুলছে পাকা টুসটুসে কমলালেবু। এই গ্রামের মূল বাসিন্দা লেপচারা। তাদের বেশিরভাগ বাড়িই কাঠের। সব বাড়িতেই নানা রঙের ফুলের সাথে আছে কমলালেবুর বাগান।
কমলালেবুর গ্রাম হিসেবে পরিচিত সিটং গ্রামের কমলাবাগান; ছবি : শাটারস্টক
এখানকার পাহাড়ের দু'টি ভাগ- আপার ও লোয়ার। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ি। এই গ্রামে ঢুকতেই একরাশ হিমেল বাতাস আপনাকে স্বাগত জানাবে।
শীতে কমলালেবুর মৌসুমে গোটা গ্রামই কমলা রঙ ধারণ করে। এই গ্রামের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে হেঁটে চলার আনন্দই আলাদা। নীরব নৈসর্গের মাঝে হিমালয়ান পাখি এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতির শোভা এই পাহাড়ি জনপদের রূপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আপার সিটং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য খুব পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন। কুয়াশা আর মেঘ একটু কেটে গেলেই হল। এছাড়া আপার সিটং-এ সব হোমস্টেগুলো রয়েছে।
লোয়ার সিটং এ আছে রিয়াং নদী। সিটং এর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে এই নদী। চাইলে পায়ে হেঁটেই পার হওয়া যায় এটি।
এই নদীর ধারে বসে অপার নিস্তব্ধতায় নিজেকে হারিয়ে নিয়ে যেতে পারেন অন্য কোনও জগতে। এই নদীর উপরে একাকী একটি সুন্দর ব্রিজ দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিজটি থেকে প্রকৃতির অপরূপ শোভা দেখা যায়।
সিটংয়ের পাহাড়ের মাথায় আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে সুপ্রাচীন সুন্দর গির্জা। এটি প্রায় ১০০ বছরের পুরনো একটি গির্জা। এর ভেতরের নীরবতা আপনার মনকে শান্ত করে তুলবে। ভোর বা সূর্যাস্তের সময় গিয়ে এই গির্জার নিস্তব্ধতা উপভোগ করতে পারেন।
সিটং থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে আছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত মংপু। মংপুর কবিগুরুর বাড়ি একেবারে ঝাঁ চকচকে। কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়ি থেকে ঘুরে আসলে মনটা চনমনে হয়ে উঠবে।
মেঘে ঢাকা সিটং এর নির্জনতা মুগ্ধ করে যেকোন পর্যটককে; ছবি : ট্রিপোটো ডট কম
চলে যেতে পারেন পাইনের জঙ্গলে ঘেরা নামথিং লেকে। বর্ষাকাল ছাড়া এই লেকে একেবারেই পানি থাকেনা। এই লেকের কিছুটা দূরেই রয়েছে অহলধারা। এখানকার শেলপু হিলস থেকে সূর্যোদয় দেখা যায়।
সূর্যোদয়ের অপার রূপের সাথে চারপাশের ছোট ছোট পাহাড় ও তাদের সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করবে।
এখান থেকে কিছুটা দূরেই আছে লাটপেনচর ফরেস্ট। আঁকাবাঁকা জঙ্গলের পথ ধরে যেতে অনুভব করবেন অপার নিস্তব্ধতার সৌন্দর্য। টিকিট কেটে এই জঙ্গলের বেশ ভিতরে ঢোকা যায়। তবে খুব বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো। জঙ্গলের ভিতর সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে।
এই গ্রামে থাকার জন্য গড়ে উঠেছে বেশ কিছু হোমস্টে। তাদের আতিথেয়তা আর অরগানিক খাবারের বাহার আপনার মনে রয়ে যাবে দীর্ঘদিন। উদার প্রকৃতির মাঝে সহজ সরল গ্রামবাসীর আন্তরিক আতিথেয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবে।
যেভাবে যাবেন :
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়িতে করে আড়াই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে সিটং পৌঁছতে। গাড়ি আগে থেকে বুক করে নিবেন। এছাড়া এনজেপি থেকেও গাড়ি ভাড়া করা যায়।