আমদহ : মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া এক স্থাপত্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মেহেরপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নত্বাত্তিক নিদর্শন

Architecture-Of-Amda-Village-Meherpur আমদহ গ্রামের স্থাপত্য, মেহেরপুর। ছবি : ভ্রমণ গাইড

 প্রাচীন নোনাধরা দেয়াল, আর তাতে ঝুলন্ত গাছের ঝুরি, উন্মুক্ত সদর দরজা বহু আগেই তার জৌলুস হারিয়েছে, ঝুল বারান্দাটায় এখন ও গাছের ফাক গলে রোদ্দুর খেলা করে ঠিক যেমন করত শতবর্ষ আগে। চৌকাঠ এবং ছাদের কড়ি বরগাগুলো যেন বয়সের ভারে ক্ষান্ত দিয়েছে এবার। সাবেকী আমলের লাল ইটের পোড়ামাটির দালান আর মোটা স্তম্ভগুলো যুগের পর যুগ টিকে আছে মহাকালের সাক্ষী হয়ে। বলা হচ্ছে দেশের ক্ষুদ্রতম জেলা মেহেরপুরের আমদহ গ্রামে অবস্থিত এক প্রাচীন স্থাপত্যের কথা। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই জেলাটিতে এমন অনেক প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে যা হয়ত অনেকের কাছেই অজানা। মেহেরপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অবস্থান জেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সঠিক বয়স সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টাব্দ ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যেই এর নির্মাণকাল।

amdoho-gramer-sthapotto-nidorshon নোনা ধরা প্রাচীর যেন ইতিহাসের সাক্ষী । ছবি : ভ্রমণ গাইড

 প্রায় ১ বর্গকিলোমিটার আয়তনজুড়ে অবস্থান করা এই স্থাপত্যের চারিদিকজুড়ে ছিল খনন করা গভীর পরীখা। বহি:শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা পাবার জন্যেই তৎকালীন বড় বড় শহর বা দুর্গের চারিপাশে খনন করা হত পরীখা। পরীখার চারিপাশে সাধারণত দেয়াল দিয়ে ঘেরা থাকলেও এই স্থাপত্যের চারিপাশে ছিল না কোন প্রাচীরের উপস্থিতি। ধারণা করা হয়, এই স্থাপনা ছিল অত্র অঞ্চলের তৎকালীন রাজা চৌধুরীদের বাসভবন। রাজা গোয়ালা চৌধুরীর শাসনামলে এই অঞ্চলে আঘাত হানে বগা দস্যুদল। রাজা গোয়ালা চৌধুরীর সাথে বগা দস্যুদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এই আবাসস্থল। এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ এই রাজবাড়িতে এখন আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তেমন কিছুই অবশিষ্ট নাই, তবে এই স্থানের খনন কাজের সময় মাটির নিচ হতে প্রাপ্ত একটি প্রত্নতত্ত্ব স্তম্ভ মেহেরপুর পুরাতন জেলা প্রশাসকের ভবনের সামনে স্থাপন করা রয়েছে।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ছুটে যায় এই স্থাপনা দেখতে। আপনিও ঘুরে আসতে পারেন এককালের এই রাজবাড়ি থেকে। অতীতের সান্নিধ্যে কাটানো সময় বৃথা যায় না কখনোই। এই স্থাপনার পাশাপাশি মেহেরপুরের বিখ্যাত মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, আমঝুপি নীলকুঠী, ভাটপাড়ার নীলকুঠি ইত্যাদি স্থান থেকে ঘুরে আসতে পারেন। আমের সময়ে গেলে মেহেরপুরের আম খেয়ে আসতে ভুলবেন না, রাজশাহী, দিনাজপুরের পরেই মেহেরপুর চুয়াডাঙ্গার আম ও কিন্তু বিখ্যাত। আর যখনই যান মেহেরপুরের বিখ্যাত 'সাবিত্রী' মিষ্টি খেয়ে আসবেন অবশ্যই, এর স্বাদ মুখে লেগে থাকবে। পুরাতন জৌলুস, বাদ্য-বাজনা, হাক ডাক আর সেই যৌবন হারিয়ে আজ যেন নিঃস্ব, রিক্ত হস্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই স্থাপনাটি। সব হারালেও সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে শতবছরের পুরান ইতিহাসের, নতুন যুগের মানুষদের কে ডেকে ডেকে যেন এটাই বুঝাতে চাচ্ছে দেখো নশ্বর এই পৃথিবীতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়, আজকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাড়ালেও একদিন ঠিকই সময়ের কাছে মাথা নত করতেই হবে। নিয়তির এই অমোঘ বিধানই যেন যুগ যুগ ধরে বলে চলেছে এই স্থাপত্য।

কিভাবে যাবেন : আমদহ গ্রামের এই স্থাপত্য দেখতে হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে মেহেরপুর সদরে । ঢাকা থেকে সড়কপথে মেহেরপুর সদরের দূরত্ব ৩১২ কিলোমিটার। পৌঁছাতে সময় লেগে যেতে পারে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা । সড়কপথে ঢাকা থেকে মেহেরপুর আসার দুটি পথ রয়েছে, গাবতলী থেকে দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ফেরিঘাট হয়ে মেহেরপুর অথবা গাবতলী থেকে যমুনা সেতু হয়ে মেহেরপুর। সড়কপথে ঢাকা টু মেহেরপুর বেশ কিছু পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল করে, তার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স, দর্শনা ডিলাক্স, এমএম পরিবহন , জেআর পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন উল্লেখযোগ্য। বাসভেদে ভাড়া পড়বে ৩৫০-৪০০ টাকা। মেহেরপুর সদর থেকে অটোরিকশা অথবা ভ্যানে করে সোজা চলে যাওয়া যায় আমদহ গ্রামে।   


তথ্যসূত্র : http://www.meherpur.gov.bd/site/tourist_spot/d0c9879c-1c3a-11e7-8f57-286ed488c766/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%A6%E0%A6%B9%20%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%20%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B6%E0%A6%A8 http://blog.bdlst.com/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%A6%E0%A6%B9-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B6%E0%A6%A8-2