মুন্নার : দক্ষিণ ভারতের ঐশ্বরিক কাশ্মীর
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মুন্নার : ভারতে ফরাসিদের প্রথম বাসস্থান

কেরালার মুন্নার অবস্থান
মুন্নার এর অবস্থান ভারতের দক্ষিণ পশ্চিমে। কেরালা রাজ্যের মাঝে মুন্নার শহরের অবস্থান। কেরালার অপরূপ সৌন্দর্য সম্পর্কে কম-বেশি সকল পর্যটকই অবগত। আর এই কেরালার মাঝে সৌন্দর্যের আরেকটি মুক্তো হল মুন্নার শহর। মুন্নারকে বলা হয় কেরালার কাশ্মীর। মুধিরাপুজা , নাল্লাথানি এবং কুন্দালি- এই তিন নদীর স্রোত একসাথে মিলিত হয়েছে মুন্নারের ঠিক মাঝখানটায়।সম্ভবত এই কারণেই মুন্নারের আবহাওয়া ও প্রকৃতি এতোটা ভিন্ন ও নির্মল। এখানকার গাছপালা, জীবজন্তুসহ সবকিছুতেই আছে ভিন্ন এক সৌন্দর্য।শহরের ইতিহাস
সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এই শহরটি প্রায় ১৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ভারতে এসে ফরাসিরা তাদের প্রথম বাসস্থান গড়ে তোলে মুন্নার শহরে। আর সেই অস্তিত্বেরই প্রমাণ পাওয়া যায় এখানকার বিভিন্ন স্থাপত্যগুলোতে। নান্দনিক সব ফরাসি স্থাপত্যের দেখা মিলে এই শহরটিতে। এই শহরটি ছিল দক্ষিণ ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের গ্রীষ্মকালীন অবসর যাপনের জায়গা৷
ঐতিহ্য আর প্রকৃতির সম্মীলন
প্রকৃতি এখানে বড্ড বেশি মোহনীয়। প্রকৃতি যেনো তার সকল সৌন্দর্য উপর করে ঢেলে দিয়েছে এখানে। পাহাড়ের পর পাহাড়, তারা মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে আকাশের গায়ে। চারপাশটা অপার সবুজে ঢাকা৷ পথে যেতে যেতে দু-পাশে বিরামহীন সবুজে ঢাকা চায়ের বাগান। বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এই চা বাগান যেনো সবুজের চাদর মুড়ি দিয়ে আছে। চা গাছের মাঝে মাঝে সোজা মাথা তুলে আকাশের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে আছে সারি সারি পাইন গাছ। সবুজে সবুজে মাখামাখির শহর হল এই মুন্নার। দিগন্তজোড়া এই সবুজের নিসর্গে আরও বেশি চমক লাগিয়েছে ছোট ছোট নদী, জলপ্রপাত আর পুরনো আমলের সব বাংলো। বিশ্ব বিখ্যাত টাটা চা-এর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি হয় এই মুন্নার থেকেই।আর তাই চায়ের এই স্বর্গে পর্যটকরা চা বাগানের নিসর্গের সাথে দেখতে পান চা প্রক্রিয়াকরণের নানান কিছু। টাটা মিউজিয়ামে দেখতে পাবেন, কীভাবে চা গাছ থেকে শুরু করে প্যাকেটজাত করা হয়। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর এই জাদুঘরে একটি ফ্রি ট্যুর দেওয়া হয়। সেখানেই চা সংক্রান্ত সবকিছু স্বচক্ষে দেখতে পারবেন। শুধু চা বাগানই নয়, মুন্নারে পর্যটকদের জন্য আরও অনেক আকর্ষণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি হল এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান। এই পার্কটি দেভান পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত। উদ্যানের পুরোটাই সবুজ-শ্যামল গাছে ছাওয়া। এখানে বিরল নীলগিরি টাহর মোষের দেখা পেলেও পেতে পারেন। এছাড়া এখানে আছে নিলাকুরাঞ্জি নামের এক ধরনের অদ্ভুত সুন্দর বিরল বেগুনি রঙা ফুল। এই ফুল ১২ বছর পর পর ফোটে। সেই সময় পুরো অঞ্চলের পাহাড় ঢেকে যায় বেগুনি চাদরে। সেই দৃশ্য এখানে স্বর্গীয় সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।

মাতুপত্তি
মুন্নার শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে আরেকটি চমৎকার জায়গা হল মাতুপত্তি৷ ১,৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই মাতুপত্তি তার ড্যাম এবং হ্রদের জন্য বেশ জনপ্রিয়। চারপাশে পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই হ্রদটি অত্যন্ত সুন্দর। অপূর্ব এই মনোরম দৃশ্যের মাঝে আছে নৌকা বিহারের সুযোগ। ঘুরে বেড়ানোর জন্য এখানে আছে স্পিড বোট ও প্যাডেল বোট৷ এখানকার এই ড্যামটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, এটি পরিণত হয়েছে বন্যপ্রাণী আর পাখিদের অভয়ারণ্যে। এছাড়াও এখানে একটি ডেইরি ফার্ম আছে। এই ফার্মটি পরিচালনা করছে ইন্দো- সুইস লাইভস্টক প্রজেক্ট।জলপ্রপাত এবং হিল স্টেশন
মুন্নারের কাছেই চিন্নাকনালে আছে চমৎকার জলপ্রপাত। সমুদ্র তল থেকে ২০০০ মিটার উচ্চতায় একটি খাঁড়া পাথর থেকে এই জলপ্রপাতটি ঝরে পড়ছে অবিরাম। এই জলপ্রপাতের সাথে এখানে আছে পর্বত মালার অপূর্ব সৌন্দর্য। চিন্নাকনাল থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে আছে আনয়িরঙ্গল সবুজ চা বাগান। এই চা বাগানে আছে মোহনীয় সৌন্দর্যের জলাধার আর চিরহরিৎ অরণ্য। যার রূপে বিমুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। মুন্নার থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে আছে জনপ্রিয় হিল স্টেশন টপ স্টেশন। এটি মুন্নারের সর্বোচ্চ ভিউ পয়েন্ট ৷ এর চারিদিক পাহাড়ে ঘেরা। কিছুটা পথ হেঁটে কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছাতে হয় এই ভিউ পয়েন্টে ৷ এখান থেকে দেখতে পাবেন রোদ -বৃষ্টির অপরূপ লুকোচুরি খেলা৷ এর নীচে আছে থেনি শহর৷ এছাড়া প্রতিবেশী রাজ্য তামিলনাড়ুর অপার সৌন্দর্য এখান থেকে চোখে পড়ে। পাহাড়ের চুড়ায় মেঘের ভেলা আর চারপাশের সবুজের গালিচার এই অপূর্ব দৃশ্য আপনাকে মোহিত করবে।যেভাবে যাবেন :
ভারতের বেশিরভাগ রাজ্য থেকেই বাসে করে মুন্নার যাওয়া যায়। কচি শহর থেকে মুন্নার দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। এখান থেকে রেলে করে যেতে পারেন। এছাড়া ক্যাব এ চড়েও যাওয়া যায়। সময় লাগবে ৩-৪ ঘণ্টা। রেলে আসলে এরনাকুলাম বা আলুভা স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে মুন্নার পৌঁছতে পারেন।যেখানে থাকবেন :
মুন্নারে থাকার জন্য অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্ট আছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে থাকতে চাইলে বেছে নিতে পারেন কোনও চা বাগানের রিসোর্ট। এই রিসোর্টগুলোতে পাবেন অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা। রাত হওয়ার পর দেখবেন রুমের ভিতরে মেঘ এসে খেলা করছে। সকালে চায়ের কাপ হাতে চারপাশের অসাধারণ দৃশ্য আয়েশ করে উপভোগ করতে পারবেন।রুবাইদা আক্তার এস এম